বাংলাদেশ ডেস্ক
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে ব্যালট পেপার, অফিসিয়াল সিল ও ব্রাস সিলসহ ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত নির্বাচনি সামগ্রীর যাচাইকরণ, নিরাপত্তা কোড নম্বর সংরক্ষণ এবং গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছে। গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি ২০২৬) ইসি সচিবালয়ের উপসচিব (নির্বাচন পরিচালনা–২ অধিশাখা) মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এ পরিপত্রটি প্রকাশিত হয়।
পরিপত্রে নির্বাচন–সংক্রান্ত সামগ্রী ভোটকেন্দ্রে পাঠানো ও গ্রহণের প্রতিটি ধাপে যথাযথ যাচাই, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোটকেন্দ্রভিত্তিক প্রেরিত নির্বাচনি ফরম, প্যাকেট, খাম, পরিচয়পত্র, নির্দেশিকা, সিল, অমোচনীয় কালি, স্ট্যাম্প প্যাড, স্ট্যাম্প, ব্যালট পেপারসহ সব সামগ্রী পূর্বে জারিকৃত পরিপত্র–১৩ এর সঙ্গে সংযুক্ত বিতরণ তালিকা অনুযায়ী সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখতে হবে। ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর তালিকায় উল্লেখিত চাহিদার সঙ্গে বাস্তবে প্রাপ্ত সামগ্রীর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতে হবে। যাচাইয়ের সময় কোনো সামগ্রী চাহিদার তুলনায় কম বা বেশি পাওয়া গেলে, তা অবিলম্বে সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জানাতে হবে এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ইসি পরিপত্রে ব্যালট পেপারের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান থেকে—বিজি প্রেস, গভর্নমেন্ট প্রিন্টিং প্রেস বা সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস—সরবরাহকৃত ব্যালট পেপার রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর পুনরায় ফরম–৫ অনুযায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম ও প্রতীক মিলিয়ে দেখতে হবে। ব্যালট পেপার এবং সংশ্লিষ্ট মালামাল ভোটকেন্দ্রে বিতরণের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ব্যালট পেপার প্রিজাইডিং অফিসারদের মধ্যে বিতরণের পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণের দায়িত্ব রিটার্নিং অফিসারের। সংরক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে যাতে ব্যালট পেপারের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যালট পেপার পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণের সময় কোনো অবস্থাতেই অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ বা হস্তক্ষেপ ঘটতে দেওয়া যাবে না।
পরিপত্রে অফিসিয়াল সিল ও ব্রাস সিলের নিরাপত্তা কোড নম্বর সংরক্ষণ এবং গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। নির্বাচনি সামগ্রীর মধ্যে অফিসিয়াল সিল, মার্কিং সিল ও ব্রাস সিল—এই তিন ধরনের সিল ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত হবে। এর মধ্যে অফিসিয়াল সিল ও ব্রাস সিলে বিশেষ নিরাপত্তামূলক কোড (কোড মার্ক) সংযুক্ত থাকে। এই কোড নম্বরগুলো কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করবেন। সিল বিতরণের সময় সহকারী রিটার্নিং অফিসারগণ কোন ভোটকেন্দ্রে কোন নিরাপত্তা কোডযুক্ত সিল সরবরাহ করা হলো, তা কেন্দ্রভিত্তিক বিতরণ রেজিস্টারে লিখে রাখবেন। একইসঙ্গে প্রতিটি সিলের স্পষ্ট ছাপ (সিল ইমপ্রেশন) বিতরণ রেজিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে যাচাইয়ের প্রয়োজনে তা মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয়।
প্রিজাইডিং অফিসারদের ক্ষেত্রেও সিলের নিরাপত্তা কোড সংরক্ষণ ও ব্যবহার–সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের কোন কক্ষে কোন কোড নম্বরযুক্ত অফিসিয়াল সিল ব্যবহৃত হবে, তা প্রিজাইডিং অফিসার একটি সাদা কাগজে লিখে রাখবেন। সেই কাগজে সংশ্লিষ্ট কক্ষ নম্বর, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের নাম, নিরাপত্তা কোড নম্বরের পাশে সংশ্লিষ্ট সিলের ছাপ নিতে হবে। এই কাগজটি একটি খামে ভরে হেসিয়ান বড় ব্যাগ বা বড় বস্তায় সংরক্ষণ করতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষে সিল, ব্যালট পেপার ও অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী ফেরত বা পুনঃসংরক্ষণের সময় এই রেজিস্টার ও সিল–ইমপ্রেশনকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে সামগ্রীর সঠিকতা পুনরায় যাচাই করতে হবে।
ইসি পরিপত্রে নির্বাচনি সামগ্রীর পরিবহন, প্রেরণ ও গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা–সম্পর্কিত নীতিমালার কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোটকেন্দ্রে প্রেরিত নির্বাচনি দ্রব্যাদি গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গ্রহণ রেজিস্টারে স্বাক্ষর করতে হবে এবং বিতরণ তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তা বুঝে নিতে হবে। ভোটকেন্দ্র থেকে সামগ্রী গ্রহণের সময় বা ফেরত পাঠানোর সময় কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনি সামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবহন কাজে নিয়োজিত যানবাহন, ব্যাগ–সিলিং, স্টোরেজ রুমের সুরক্ষা, তালা–চাবির নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
পরিপত্রে নিরাপত্তা কোড, ব্যালট পেপার ও সিলের ছাপ সংরক্ষণ সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো মূলত নির্বাচনি সামগ্রীর অননুমোদিত ব্যবহার, প্রতিস্থাপন বা জালিয়াতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোড–সংরক্ষণ ও সিল–ইমপ্রেশনের নিবন্ধন ব্যবস্থা সিলের ট্রেসেবিলিটি (অনুসরণযোগ্যতা) নিশ্চিত করে এবং নির্বাচনি সামগ্রীতে সম্ভাব্য কারচুপির ঝুঁকি কমায়। পাশাপাশি ব্যালট পেপারের সুরক্ষিত সংরক্ষণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার মৌলিক পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় ব্যালট পেপার, সিল, অমোচনীয় কালি ও ফরমসহ নির্বাচনি সামগ্রী কেন্দ্রভিত্তিক বণ্টন একটি উচ্চ–নিরাপত্তাসম্পন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত। অতীত নির্বাচনগুলোতে সামগ্রীর সঠিকতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই–ব্যবস্থা থাকলেও, নিরাপত্তা কোড সংরক্ষণ ও সিল–ইমপ্রেশনের কেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধনকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে জারিকৃত এ পরিপত্রে সেই নিরাপত্তা কাঠামো আরও জোরদার করার বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
পরিপত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র পর্যায়ে নির্বাচনি সামগ্রীর যথাযথ ব্যবহার, ব্যালট পেপারের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সিলের নিরাপত্তা কোড নম্বরের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ইসি। নির্বাচন–পরিচালনায় যুক্ত মাঠ–পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য এ নির্দেশনাগুলো বাধ্যতামূলক এবং পরিপত্র লঙ্ঘন নির্বাচন আচরণ–সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী প্রশাসনিক জবাবদিহিতার আওতায় আসবে।
ইসি জানিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি সামগ্রীর বণ্টন, পরিবহন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত নিরাপত্তা–সংক্রান্ত সব নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। নির্বাচনি সামগ্রীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার এই পরিপত্রটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভোটপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


