যুক্তরাষ্ট্র–গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে মেলোনির সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্র–গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে মেলোনির সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে—এমন সম্ভাবনায় তিনি বিশ্বাস করেন না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা ন্যাটো জোটের জন্য গুরুতর কৌশলগত, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করবে এবং জোটের ঐক্য ও ভবিষ্যৎ কার্যকারিতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন বছরের ঐতিহ্যবাহী সংবাদ সম্মেলনে রোমে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর উপস্থিতি জোরদার করলে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ প্রশমিত করা সম্ভব, একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর প্রভাব বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলা করা যাবে এবং ওয়াশিংটনের একতরফা সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপও কমে আসবে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব, আর্কটিকের ভূরাজনীতি, ন্যাটোর নিরাপত্তা কৌশল এবং ইউরোপ–উত্তর আমেরিকার সম্পর্ক ঘিরে কূটনৈতিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ তীব্র হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মেলোনি বলেন, ‘আমি এখনো মনে করি না যে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক অভিযান চালাবে—এমন কোনো সম্ভাবনায় আমি বিশ্বাস করি। এমন একটি বিকল্পকে আমি স্পষ্টভাবেই সমর্থন করব না।’ তিনি আরও বলেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থানে থাকা এই বিশাল ভূখণ্ড দখল করা কোনো পক্ষের স্বার্থেই হবে না।

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যা ১৯৭৯ সালে হোম রুল এবং ২০০৯ সালে সেলফ গভর্নমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ক্ষমতা লাভ করে। তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতি এখনও ডেনমার্কের অধীন। আর্কটিক মহাসাগর, প্রাকৃতিক সম্পদ, বিরল খনিজ, ভূকৌশলগত সামরিক গুরুত্ব, শিপিং লেন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য অঞ্চল।

সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের সক্রিয়তা বৃদ্ধি, বরফ গলে নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হওয়া এবং খনিজ সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা জোরালো হওয়ায় ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে কৌশলগত মূল্যায়ন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

হোয়াইট হাউস মঙ্গলবার জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিকল্প যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করছে। এই ঘোষণার পরপরই ইউরোপীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

মেলোনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পদক্ষেপ ন্যাটোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে—এটা ‘সবার কাছেই স্পষ্ট’; আর এ কারণেই তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত সামরিক হুমকি বাস্তবায়ন করবে না। তার মতে, সামরিক অভিযান ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোকে কেবল চাপের মুখেই ফেলবে না, বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করবে, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির নৈতিক ও আইনি ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর জন্য কূটনৈতিক সুবিধা তৈরির পথও উন্মুক্ত করে দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা বিষয়ে আমি ট্রাম্পের সঙ্গে একমত। গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে আমি একমত নই।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানের পর আর্কটিক নীতি ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটেই তার বক্তব্য এসেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ নেতা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানে আটক করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও, মেলোনি জানান তিনি ওই অভিযানকে সমর্থন করেছিলেন। তবে গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে তার অবস্থান ভিন্ন।

মেলোনি বলেন, ‘স্পষ্ট করে বললে, এটি যুক্তরাষ্ট্রেরও স্বার্থে হবে না।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভূখণ্ড অধিগ্রহণে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ফলে আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামো ও মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বিত নীতির যে ভারসাম্য রয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ন্যাটো জোটের সামগ্রিক বৈধতা , সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ যৌথ সামরিক পরিকল্পনায় কৌশলগত বিচ্যুতি ঘটার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তিনি একই সঙ্গে আর্কটিকে ন্যাটোর উপস্থিতি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ‘অন্যান্য পক্ষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ—যারা এমনকি শত্রুভাবাপন্নও হতে পারে—ঠেকানোর প্রয়োজন’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ রয়েছে, তা তিনি বোঝেন। তার মতে, আর্কটিক অঞ্চলে জোটভুক্ত নজরদারি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ও কৌশলগত অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করলে যুক্তরাষ্ট্রের একক সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব।

মেলোনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের অভিষেকে উপস্থিত থাকা একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্কের কারণে ইউরোপ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনে ইতালি কৌশলগত সেতুবন্ধনের ভূমিকা নিতে পারে।

তবে সংবাদ সম্মেলনে মেলোনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমার দ্বিমত আছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমি মনে করি আন্তর্জাতিক আইনকে দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা জরুরি… যখন আমার দ্বিমত হয়, আমি তাকে তা বলি—এতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।’

গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ, আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা সমীকরণ এবং ইউরোপ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি—এসব ইস্যু আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ