দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে তারেক রহমান–পাক হাইকমিশনার বৈঠক

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে তারেক রহমান–পাক হাইকমিশনার বৈঠক

রাজনীতি ডেস্ক

ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও জনগণ-পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিএঠকের শুরুতে তারেক রহমান ও হাইকমিশনার ইমরান হায়দার কুশলবিনিময় করেন এবং দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। বৈঠকে মূলত বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক উন্নয়নের রূপরেখা প্রাধান্য পায়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নীতিনির্ধারক, যদিও প্রতিবেদনে কারও ব্যক্তিগত মন্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর সম্পর্কের সূচনালগ্নে কিছু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক জটিলতা থাকলেও পরবর্তী দশকগুলোতে বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশ সার্ক, ওআইসি, ডি-৮ ও কমনওয়েলথের মতো বহুপাক্ষিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করে। পাকিস্তান বাংলাদেশে তুলা, সুতা, সিমেন্ট, রাসায়নিক সার, চিনি, ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যালস ও হিমায়িত খাদ্য পাকিস্তানে রপ্তানি হয়।

বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে জানা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে শুল্ক–বাধা কমানো, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার সহজীকরণ, সরাসরি কার্গো শিপিং রুট চালু, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন সহজীকরণ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নিয়মিত বিনিময় কার্যক্রম চালু করার মতো বিষয়গুলো কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। বাংলাদেশ–পাকিস্তান সরাসরি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন সীমিত হওয়ায় বাণিজ্য খরচ তুলনামূলক বেশি, ফলে সরাসরি শিপিং রুট চালু হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি–আমদানি প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় কমবে—এ ধরনের নীতিগত দিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

দুই দেশের জনগণ-পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রসঙ্গও বৈঠকে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বিদ্যমান, তবে পর্যটন, শিক্ষার্থী বিনিময়, সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল, গবেষণা–সহযোগিতা ও ক্রীড়া বিনিময় বাড়ালে সম্পর্ক আরও গভীরতর হতে পারে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে। একইভাবে পাকিস্তান থেকেও কিছু শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসে, যদিও সংখ্যাটি তুলনামূলক কম। শিক্ষাক্ষেত্রে যৌথ গবেষণা তহবিল, বিশ্ববিদ্যালয়–সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), স্কলারশিপ সম্প্রসারণ এবং গবেষক–বিনিময় কার্যক্রম বাড়ানো হলে মানবসম্পদ উন্নয়নে উভয় দেশ উপকৃত হতে পারে—এ ধরনের প্রেক্ষাপট আলোচনার কাঠামোতে যুক্তিসংগতভাবে প্রাসঙ্গিক।

বৈঠকে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য–রুট সংযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং জনগণ-পর্যায়ে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা—এসব বিষয় আঞ্চলিক কূটনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশই সন্ত্রাসবাদ দমন, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ–সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে ভবিষ্যতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে—এ ধরনের নীতিগত সম্ভাবনা দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি প্রধান রাজনৈতিক দল এবং দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে দলীয় নীতিনির্ধারণ ও কৌশলগত নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ফলে বিদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠককে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়। কূটনৈতিক রীতিতে এ ধরনের সাক্ষাৎকে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলা হলেও বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক সংযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো কৌশলগত ইস্যু আলোচনায় উঠে আসে—যা রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক উভয় প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক।

পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে কাজ করে, বিশেষত বন্দর অবকাঠামো ও বাণিজ্য–রুটের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধমান রপ্তানি অর্থনীতি, তরুণ জনশক্তি, পোশাকশিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। ফলে বাণিজ্য ও সংযোগ–সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে দুই দেশেরই অর্থনৈতিক লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৈঠকের সময়কার একটি ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে তারেক রহমান ও পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দারকে বৈঠককক্ষে একসঙ্গে দেখা যায়। তবে এ প্রতিবেদনে কোনো পক্ষের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি, মূল্যায়ন, প্রচারণামূলক ভাষা বা আবেগপ্রবণ বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তথ্য–উপাত্ত যাচাই ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি একটি আনুষ্ঠানিক, নীতিনির্ভর সাক্ষাৎ, যার লক্ষ্য ছিল দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে মতবিনিময় করা।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে বাণিজ্য–সংযোগ, শিক্ষা–সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, নিরাপত্তা–সহযোগিতা ও জনগণ-পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর। কূটনৈতিক আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, বাণিজ্য–খরচ কমানো, সরাসরি শিপিং রুট চালু, স্কলারশিপ সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা–সহযোগিতা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—যা দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ