আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্কের নতুন চিত্রের মধ্যে সৌদি আরব ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যপ্রতি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্কের সক্রিয় তদবির চলছে। বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে। আলোচনার সফল বাস্তবায়ন ঘটলে অঞ্চলটিতে তিনটি শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন ধরনের সামরিক জোট গড়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সমঝোতার মধ্যমণি হওয়ার চেষ্টা করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এই আলোচনা এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ব্যাপক।
ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা ইতিমধ্যে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সম্প্রসারণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্ক-সমর্থিত সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের অস্ত্রচুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ১০টি কারাকোরাম-৮ হালকা আক্রমণকারী ফাইটার জেট, নজরদারি ও কামিকাজে হামলার জন্য ২০০টির বেশি ড্রোন এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করা হতে পারে।
যদি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তাহলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি বৃহৎ রাষ্ট্রকে এক কৌশলগত সুতায় আবদ্ধ করবে। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব আরব বিশ্বের একমাত্র জি-২০ অর্থনীতি এবং ইসলাম ধর্মের দুটি পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার নিয়ন্ত্রক। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র, এবং তুরস্কের ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী রয়েছে।
সম্প্রতি ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা দ্রুত গতিতে বড় অস্ত্র উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হচ্ছে। তুরস্ক ইউক্রেনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ড্রোন সরবরাহ করেছে, সিরিয়ায় প্রধান সামরিক মিত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এবং লিবিয়াতেও সেনা মোতায়েন রয়েছে। একইভাবে পাকিস্তান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করছে। গত ডিসেম্বরে পাকিস্তান লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেখানে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার আলোচনা হচ্ছে। এই বিমানগুলো চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে উৎপাদিত। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তবে সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। আরব বসন্তের সময় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গণ-আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান, যা সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছিল। একইভাবে, পূর্বে সৌদি আরব ও ইউএই লিবিয়ায় তুরস্কের বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল।
বর্তমান সময়ে তুরস্ক ও সৌদি আরব আবার কৌশলগতভাবে কাছাকাছি এসেছে। উভয় দেশই সুদানের গৃহযুদ্ধে একই পক্ষকে সমর্থন করছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইউএইর মধ্যে ইয়েমেন ইস্যুতে বিরোধ তৈরি হয়েছে, যেখানে সৌদি বাহিনী ইউএই সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতিকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যেখানে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে অঞ্চলটি রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যের নতুন ধারা অনুসরণ করবে।


