জাতীয় ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের প্রস্তুতি হিসেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হলেও কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের সম্ভাবনা এবং বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার খরচ কমিশনের বহন করা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা প্রকৃতভাবে ফল নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই তিনটি নির্বাচনে ফল প্রভাবিত করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রশাসনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই প্রেক্ষাপটে জনগণের মধ্যে ভোটবিমুখতার প্রকোপ দেখা দেয়, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে নির্বাচন কমিশনের সামনে রয়েছে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ। একদিকে রয়েছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের চাপ, অন্যদিকে অতীত বিতর্কিত নির্বাচনের দায় থেকে মুক্ত থাকা। কমিশন এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেছে, যার মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্রে ভোটের উপযোগী অবকাঠামো তৈরি এবং পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ অন্যতম।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, কমিশনের কার্যক্রম মোটামুটি ইতিবাচক হলেও স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক অভিযোগ যেন আর উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে দুই ডজনেরও বেশি দেশ এবং অন্তত ৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থা পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেবেন। তবে পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় কমিশন বহন করবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই সিদ্ধান্তকে স্বার্থের সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের খরচ বহন করলে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
নির্বাচন কমিশন একা দায়িত্ব পালন করে না; প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্বাচন কেমন হবে তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভরশীল। ভোট শান্তিপূর্ণ রাখতে প্রস্তুতিতে কোনো ত্রুটি রাখা যাবে না।
একই সময়ে, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক রাজনৈতিক হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং পর্যবেক্ষকদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবারের নির্বাচন ও গণভোটের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সর্বোপরি, নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রতিটি স্টেকহোল্ডারের দায়িত্ব, যা ভোটের ফলাফল গ্রহণযোগ্য এবং জনগণের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


