চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন

চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন

 আইন আদালত  ডেস্ক

চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ ও আদালতে স্বীকারোক্তি এবং তদন্তের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত ষড়যন্ত্রের চিত্র উদ্ঘাটন হয়েছে। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তরা অগ্নিসংযোগের আগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাড়ির মালিকদের হাতে মোট ১৩ লাখ টাকা প্রদান করেছিল।

গত সোমবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে গ্রেপ্তার আসামি মনির হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এতে তিনি উল্লেখ করেন, রাঙামাটির এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দেওয়ার নির্দেশনা পান। প্রতিদানে তাকে এক লাখ টাকা এবং রাঙামাটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

মনির হোসেন আদালতে জানান, আগুন দেওয়ার আগে বাড়ির লোকজনকে সতর্ক করা হতো এবং পোষা প্রাণী সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। অগ্নিসংযোগের সময় ঘরের বাইরে পুরনো কাপড় ও লুঙ্গি রেখে আগুন লাগানো হতো। তিনি উল্লেখ করেন, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দেওয়ার বিস্তারিত কৌশল চূড়ান্ত করা হয়।

পুলিশ জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় মোট পাঁচটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮ ডিসেম্বর রাউজানের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়া গ্রামে সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে, পরদিন ঢেউয়াপাড়া গ্রামে দুটি হিন্দু বসতঘরে এবং ২৩ ডিসেম্বর পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামে সুখ শীল ও অনিলের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনাগুলোতে কেউ হতাহত না হলেও কয়েকটি ঘর আংশিক এবং কিছু সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে উসকানিমূলক বক্তব্যসংবলিত ব্যানার, যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের নাম এবং বিভিন্ন মোবাইল নম্বরও লেখা ছিল।

পুলিশ ও প্রশাসন প্রত্যেক ঘটনার পরপরই ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করেছেন। এ ঘটনায় রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ঢেউয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বিমল তালুকদার নিজের বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “রাতের আঁধারে এসব অগ্নিসংযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এর মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২ জানুয়ারি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কলেজগেট এলাকা থেকে মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- ওমর ফারুক, কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান এবং মো. পারভেজ। তাদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, দুটি কেরোসিন তেলের কনটেইনার, একটি কেরোসিন তেলের বোতল, কেরোসিন তেলমাখা একটি লুঙ্গি ও একটি পুরনো শার্ট, একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজি অটোরিকশা এবং একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।

আহসান হাবিব পলাশ আরও জানান, ১৫–১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিল। তারা জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানারও ব্যবহার করেছিল। ব্যক্তিগত বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

এই ঘটনা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। তদন্ত চলছে এবং প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা জোরদার করছে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ