সামরিক আইন জারির চেষ্টা ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাধা: সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

সামরিক আইন জারির চেষ্টা ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাধা: সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লকে সামরিক আইন জারির চেষ্টা, বিচারিক আদেশ বাস্তবায়নে বাধা এবং সরকারি নথি জালিয়াতিসহ একাধিক অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সিউলের সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত জানান, সংবিধান ও আইন দ্বারা নির্ধারিত ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে মার্শাল ল জারির উদ্যোগ নেওয়া এবং পরবর্তীতে গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে কর্তৃপক্ষকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউন সুক ইয়ল যে সামরিক আইন ঘোষণার চেষ্টা করেন, তা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত আইন ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। বিশেষ করে, সামরিক আইন জারির ক্ষেত্রে যে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ইউন সুক ইয়ল তা মানেননি। আদালতের মতে, জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও তিনি নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার করেন।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, মার্শাল ল–সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত কর্তৃক জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে গেলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিকবার বাধার মুখে পড়ে। আদালত রায়ে বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউন সুক ইয়ল গ্রেফতারি আদেশ বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। এই আচরণ বিচারিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং আইনের শাসনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এছাড়া, আদালত তাকে সরকারি নথি জালিয়াতির অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত করেন। রায়ে বলা হয়, মার্শাল ল জারির সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু নথিতে তথ্য বিকৃতি ও অসত্য বিবরণ সংযোজন করা হয়েছিল। এসব নথি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ায় তা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে আদালত মন্তব্য করেন।

এই রায় ইউন সুক ইয়লের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মার্শাল ল–সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার মধ্যে প্রথম বিচারিক সিদ্ধান্ত। আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায় বহন করতে হবে। বিচারক রায়ে আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক আইন একটি চরম ব্যবস্থা, যা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট পরিস্থিতিতে প্রয়োগযোগ্য; ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয়।

রায়ের পর আইন অনুযায়ী ইউন সুক ইয়লের আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তার আইনজীবীরা রায় পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেননি। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কারণ এতে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন ও নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার অতীতেও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। দেশটির সংবিধানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও বেসামরিক কর্তৃত্বের ওপর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। আদালতের এই রায় সেই সাংবিধানিক কাঠামোর গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

বর্তমানে ইউন সুক ইয়ল কারাগারে থাকবেন কি না, নাকি আপিল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জামিনের আবেদন করা হবে, সে বিষয়ে আদালতের পরবর্তী আদেশের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। তবে এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে ক্ষমতার জবাবদিহি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ