মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে ইরানি বিপ্লবী গার্ডের কড়া হুঁশিয়ারি, আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত

মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে ইরানি বিপ্লবী গার্ডের কড়া হুঁশিয়ারি, আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি লক্ষ্য করে কঠোর ভাষায় হুমকি দিয়েছেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও প্রভাবশালী রাজনীতিক জেনারেল মোহসিন রেজাই। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) প্রকাশ্য বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তার জবাব হবে কঠোর এবং তা কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রতীকী ভাষায় পাল্টা হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন।

মোহসিন রেজাই বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে তার ‘হাত পিস্তলের ট্রিগারে’। এর জবাবে তিনি বলেন, ইরান সেই হাত ও আঙুল কেটে ফেলতে সক্ষম। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে ইরানের দৃঢ় অবস্থান ও প্রতিরোধমূলক সক্ষমতার কথা তুলে ধরেন। ইরানি এই জেনারেলের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আরও সামনে নিয়ে আসে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তবে ইরান তার লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আলোচনা করবে না। তার ভাষায়, সম্ভাব্য সংঘাত শুরু হলে যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার কোনো সুযোগ থাকবে না। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইরান যে কোনো সামরিক সংঘাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির মনোভাব নিয়ে এগোতে পারে।

ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে রেজাই বলেন, ইরান এতদিন যে সংযম ও কৌশলগত ধৈর্য দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তা উপেক্ষা করছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এখনই পরিস্থিতি থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো নিরাপদ থাকবে না। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাবের ইঙ্গিত দেন।

এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে একই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা সামনে আসে। জানা যায়, ওই দেশগুলোর মধ্যস্থতার ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। পাশাপাশি পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে জানানো হয়েছে যে বর্তমানে হামলার কোনো পরিকল্পনা নেই।

তবে এসব আশ্বাসের বিষয়ে ইরান সরকার প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তেহরানের দৃষ্টিতে, অতীত অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখার সুযোগ দেয় না। ইরানের কর্মকর্তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আগের বছর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন সময়েই দেশটির ভূখণ্ডে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ও কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘদিনের উত্তেজনারই প্রতিফলন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে, অন্যদিকে ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সংঘাত এবং সামরিক উপস্থিতি—এই সব বিষয় মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমাগত চাপের মধ্যে রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরোপুরি কাটেনি। ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কঠোর বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি সহজে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক মহলের নিবিড় নজরে থাকবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ