আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে তা ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হবে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান জানান তিনি। বিষয়টি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলছে।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে ইরানের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। ওই বক্তব্যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যা দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পরপরই ইরানের প্রেসিডেন্ট পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান।
মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের ‘সর্বোচ্চ নেতার ওপর আঘাত’ দেশটির জনগণের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য হবে। তিনি আরও বলেন, ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, নেতৃত্বের নিরাপত্তা প্রশ্নে তারা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, দেশটির সাধারণ মানুষ বর্তমানে যে অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার চাপের মুখোমুখি, তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বড় ভূমিকা রাখছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি জনগণের জীবনে পড়ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির মতো সমস্যার পেছনে বহিরাগত চাপকে দায়ী করেন তিনি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সমালোচনা করে দেশটির অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেন। এসব বক্তব্যকে ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে জানুয়ারির প্রথম ভাগে কিছু এলাকায় তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। সরকারি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ওই সময় সংঘর্ষ ও দমন অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই সহিংসতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি উসকানি ও রাজনৈতিক চাপ বিক্ষোভকে সহিংস করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়াতে সক্রিয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে উত্তেজনা রয়েছে, নেতৃত্ব পরিবর্তন সংক্রান্ত বক্তব্য তা আরও উসকে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, উভয় পক্ষের বক্তব্য যদি আরও কঠোর হয়, তাহলে তা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।


