রাজধানীতে দূষণ, সংকট ও বিশৃঙ্খলায় জনজীবনে বহুমুখী চাপ

রাজধানীতে দূষণ, সংকট ও বিশৃঙ্খলায় জনজীবনে বহুমুখী চাপ

রাজধানী ডেস্ক
রাজধানী ঢাকা বর্তমানে বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মশার উপদ্রব, বিশৃঙ্খল গণপরিবহন, গ্যাস সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ একাধিক নগর সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে এসব চ্যালেঞ্জের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

নগরজুড়ে মশার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে কিউলেক্স প্রজাতির মশার আধিক্যে সন্ধ্যার পর ঘরের ভেতরেও স্বস্তি মিলছে না। বাসাবাড়িতে দরজা-জানালা বন্ধ রাখার পরও মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান বাসিন্দারা। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার বড় অংশ কিউলেক্স প্রজাতির। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, দীর্ঘদিন পরিষ্কার না হওয়া নালা-নর্দমা, জলাবদ্ধ বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকাকে এ প্রজাতির মশার প্রজননের অনুকূল ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এতে ডেঙ্গু নয়, বরং মশাবাহিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বায়ুদূষণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের প্রভাবে শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, দূষিত বাতাস ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানার নিঃসরণকে প্রধান উৎস হিসেবে ধরা হচ্ছে।

পানিদূষণও নগরবাসীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহকৃত পানিতে মাঝেমধ্যে ময়লা ও দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও সমস্যা সমাধান হলেও জার ও বোতলজাত পানির মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে সরবরাহ করা উল্লেখযোগ্য অংশের জারের পানিতে ক্ষতিকর কলিফর্ম জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে এবং কিছু বোতলজাত পানিও মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। এর ফলে ডায়রিয়া, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার অভাব দীর্ঘদিনের। বাসের রেষারেষি, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা এবং চলন্ত অবস্থায় যাত্রী নামানোর ঘটনা নিয়মিত দেখা যায়। এর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ও সড়ক অবরোধ যুক্ত হয়ে যানজট আরও তীব্র করছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তার দৈর্ঘ্য না বাড়লেও যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, ফলে গড় গতি কমে গেছে। আধুনিক ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা, ডবল ডেকার বাসের মতো বিকল্প এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

গ্যাস সংকট রাজধানীর আরেকটি বড় সমস্যা। দিনের বড় অংশে গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। শীত মৌসুমে এ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। ফলে অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানির দিকে যেতে হচ্ছে, যা ব্যয় বাড়াচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও চাপের মধ্যে রয়েছে। চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইকারীর আঘাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধ দমনে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা আলাদা নয়; বরং নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দুর্বলতার প্রতিফলন। সমন্বিত পরিকল্পনা, সুশাসন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সেবা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে রাজধানীর বাসযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব।

রাজধানী শীর্ষ সংবাদ