বিনোদন ডেস্ক
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের জনপ্রিয় অভিনেতা ও নৃত্যপরিচালক ইলিয়াস জাভেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন নায়ক ও প্রযোজক সোহেল রানা। দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রয়াণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ইলিয়াস জাভেদ মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর সোহেল রানা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ইলিয়াস জাভেদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। শোকবার্তায় তিনি বলেন, ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন তাঁর খুব কাছের একজন মানুষ। সোহেল রানার প্রযোজিত ও অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্রে জাভেদ নৃত্যপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি একটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। চলচ্চিত্রাঙ্গনে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা জীবনের শেষ পর্যন্ত অটুট ছিল।
সোহেল রানা আরও বলেন, জন্মসূত্রে পাকিস্তানি হলেও ইলিয়াস জাভেদ বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। সোহেল রানা উল্লেখ করেন, জাভেদ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। এই দেশের শিল্পজগতের জন্য তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইলিয়াস জাভেদ বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় ও নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। তিনি প্রথমে নৃত্যপরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে অভিনয়ে আসেন এবং নায়ক হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। ১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র ‘নয়ি জিন্দেগি’-এর মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
তবে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘পায়েল’-এর মাধ্যমে দর্শকমহলে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই চলচ্চিত্রের সাফল্যের পর তিনি নিয়মিতভাবে অভিনয়ের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যা তাঁকে সোনালি যুগের অন্যতম কর্মব্যস্ত অভিনেতাদের তালিকায় স্থান করে দেয়।
অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যপরিচালক হিসেবেও ইলিয়াস জাভেদের অবদান উল্লেখযোগ্য। সে সময়ের বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তাঁর পরিকল্পিত নৃত্য দৃশ্য দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়। নাচের ছন্দ, দৃশ্যায়ন ও ক্যামেরা ব্যবহারে তিনি নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের নৃত্যপরিচালকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘নিশান’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ও সামগ্রিক উপস্থিতি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। এছাড়া বিভিন্ন ঘরানার ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজের অভিনয় বৈচিত্র্য তুলে ধরেন।
ইলিয়াস জাভেদের জন্ম ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশাওয়ারে। পরবর্তীতে তিনি স্বপরিবারে পাঞ্জাবে চলে যান। কর্মজীবনের প্রয়োজনে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৮৪ সালে চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
ইলিয়াস জাভেদের মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী হিসেবে স্মরণ করছেন। অভিনয় ও নৃত্য পরিচালনার মাধ্যমে তিনি যে কর্মজীবন গড়ে তুলেছিলেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


