জাতীয় ডেস্ক
ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশা করে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষায়, কিছু ভুল বোঝাবুঝি ও অস্বস্তি সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিদেশে অবস্থান করে কোনো সাবেক সরকারপ্রধানের বক্তব্য বা তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ দেশের জনগণ ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দেয়। উভয় দেশের মধ্যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ঘটনা সামনে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সাময়িকভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নয়াদিল্লি, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সরকার এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ কখনোই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সংক্রান্ত ইস্যুতে মন্তব্য করে না। পারস্পরিক সম্মান ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপের নীতি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।
ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি বণ্টন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। সাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কূটনৈতিক মতভেদ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করে তোলা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান হলো—কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করে সকল দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও সম্মানের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। এই নীতির আলোকে ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও দেশের অবস্থান সুদৃঢ় হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাবে।
সার্বিকভাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দিকগুলো স্পষ্ট হয়—আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক কূটনীতি।


