আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে আটক করার পর দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে দ্রুত জনমত ও রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্রিয় হয়েছে, তার একটি চিত্র সম্প্রতি ফাঁস হওয়া অডিও–ভিডিওতে উঠে এসেছে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকের রেকর্ডে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ এবং কৌশলগত অগ্রাধিকারের নানা দিক স্পষ্ট হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সরকারপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে তিনি স্পিকার মোডে মোবাইল ফোনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দেলচি রদ্রিগেসকে যুক্ত করেন। ফোনালাপে রদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পরপরই সৃষ্ট পরিস্থিতি, নিজের ভূমিকা গ্রহণের প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বক্তব্য দেন।
রদ্রিগেস জানান, মাদুরো আটক হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁকে ও মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়া অথবা কঠোর পরিণতির মুখে পড়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়। রদ্রিগেস বলেন, এই চাপের মধ্যেই তাঁকে দায়িত্ব নিতে হয়। তিনি দাবি করেন, তখন থেকে এখন পর্যন্ত হুমকি ও চাপ অব্যাহত রয়েছে, যা বিবেচনায় রেখে সরকারকে সতর্ক ও কৌশলগতভাবে এগোতে হচ্ছে।
এর আগে মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও আলোচনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তিনি নিজেই একাধিকবার জানিয়েছেন, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক পথে সংলাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে তিনি।
ফাঁস হওয়া ভিডিওতে রদ্রিগেসের মূল তিনটি লক্ষ্য স্পষ্টভাবে উঠে আসে— দেশের ভেতরে শান্তি বজায় রাখা, আটক বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা। তিনি ইনফ্লুয়েন্সারদের উদ্দেশে বলেন, সরকারের ভেতরে ও বাইরে ঐক্য ধরে রাখা সবচেয়ে জরুরি। তাঁর বক্তব্যে আশঙ্কার বিষয় হিসেবে উঠে আসে, মাদুরো-পরবর্তী নেতৃত্বকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ঝুঁকি।
বৈঠকে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ইনফ্লুয়েন্সারদের সতর্ক করে বলেন, সরকারবিরোধী বিভিন্ন গুজব, ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হতে পারে। তাঁর মতে, এসব মোকাবিলায় সমন্বিত বার্তা ও সক্রিয় প্রচারণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেল বাণিজ্যকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার সময় এমন অভিযোগও আলোচনায় আসে যে, মাদুরো আটক হওয়ার আগেই সরকারের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিদেশি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। ভিডিওটি কীভাবে ফাঁস হলো, সে বিষয়েও এখনো স্পষ্ট তথ্য নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলা— কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভিডিওর বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে ভিডিও প্রকাশের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারে মন্ত্রিসভা রদবদল হয়। যোগাযোগমন্ত্রীকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভুয়া তথ্য মোকাবিলা’ শিরোনামে নতুন একটি প্রচারণা শুরু করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিডিও অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিমুখী কৌশলকে স্পষ্ট করে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে কঠোর ও প্রতিরোধমূলক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার এক সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ও বিশ্লেষকের মতে, মাদুরোকে এত দ্রুত অপসারণের পেছনে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া তা সম্ভব হতো না— এই ধারণা সরকারকে সমর্থকদের একত্রিত রাখতে নির্দিষ্ট বয়ান তৈরিতে প্ররোচিত করছে।
বিশ্লেষকদের আরও মত, ভেনেজুয়েলার সামনে বর্তমানে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে অগ্রসর হওয়া, যেখানে স্বচ্ছ নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অন্যটি হলো আন্তর্জাতিক চাপ সামলে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদী কাঠামো বজায় রাখা। ফাঁস হওয়া ভিডিও এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।


