১৮ বছরের আগেই ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ মাদক গ্রহণ শুরু

১৮ বছরের আগেই ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ মাদক গ্রহণ শুরু

স্বাস্থ্য ডেস্ক

দেশে মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে—এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে একটি সাম্প্রতিক গবেষণায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাদক গ্রহণ শুরু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বন্ধুদের প্রভাব। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে, আর সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে।

‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণ’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল গতকাল রাজধানীর শাহবাগে একটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এই গবেষণার ফলাফল দেশের মাদক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে এবং জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত মাদকনিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তাঁরা মাদক প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গবেষক দলের প্রধান এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এরপর ক্রমানুসারে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং কোডিনজাত কাশি সিরাপ ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, মাদকের ধরন ও ব্যবহারের প্রবণতায় পরিবর্তন আসলেও সামগ্রিকভাবে মাদক সমস্যার তীব্রতা কমেনি।

গবেষণায় ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ইনজেকশনভিত্তিক মাদক গ্রহণ এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা ক্রমেই একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী বাস করে ঢাকা বিভাগে। সেখানে আনুমানিক মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন। রংপুর বিভাগে এই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে খুলনায় প্রায় ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহীতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন, সিলেটে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন এবং বরিশাল বিভাগে সর্বনিম্ন ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন মাদক ব্যবহারকারী থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা এবং বড় শহরের আশপাশের এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।

মাদক গ্রহণের কারণ বিশ্লেষণে গবেষণায় উঠে এসেছে, বন্ধুদের প্রভাবই প্রধান কারণ। এ ছাড়া কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ এবং সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে কিশোর ও তরুণরা অল্প বয়সেই সঙ্গদোষের কারণে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি আসক্তিতে রূপ নেয়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ কখনোই চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবার আওতায় আসে না। যারা চিকিৎসা গ্রহণ করে, তাদের অনেকেই ধারাবাহিক ও মানসম্মত সেবা পায় না। ফলে চিকিৎসা শেষে আবার মাদক গ্রহণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। গবেষকদের মতে, টেকসই পুনর্বাসন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই গবেষণার জন্য দেশের আটটি বিভাগে ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা থেকে মোট ৫ হাজার ২৮০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে পরিমাণগত ও গুণগত—উভয় ধরনের গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণার সার্বিক ফলাফলে অনুমান করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবহার করছে। এর মধ্যে তরুণ ও কিশোরদের অংশ উল্লেখযোগ্য, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

শীর্ষ সংবাদ স্বাস্থ্য