অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একদিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোট সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের জন্য ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই প্রস্তাব অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম উদ্ঘাটিত হলে ব্যয়কারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্বাচন কমিশন দায়ী থাকবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, ব্যালট প্রস্তুতি, নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত জনবল ও প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট প্রেরণের খরচ বাড়াতে হচ্ছে। এসব কারণে কমিশন অতিরিক্ত ১ হাজার ৭০ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়।
অতিরিক্ত বরাদ্দের ক্ষেত্রে আটটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বরাদ্দকৃত অর্থ শুধু নির্বাচনী ও গণভোট সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য ব্যয় করতে হবে; অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম উদ্ঘাটিত হলে দায়বদ্ধ হবে নির্বাচন কমিশন; অর্থের বিস্তারিত বিভাজন জিও অর্থ বিভাগে পাঠাতে হবে; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫ অনুযায়ী আর্থিক বিধিবিধান মেনে অর্থ ব্যয় করতে হবে। এছাড়া পূর্বে বরাদ্দকৃত ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং নতুন বরাদ্দকৃত ১ হাজার ৭০ কোটি টাকার প্রথম কিস্তির প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী কিস্তিগুলো ছাড় করা হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে—তবে এসব কোনোটিই সংসদ নির্বাচনের দিনে অনুষ্ঠিত হয়নি। আগের সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ ছিল না। এবার সংসদ ও গণভোটের জন্য দেশে ও বিদেশে প্রবাসীদের কাছে পৃথক পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার ভোটদানের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন।
একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তুতি, ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পরিধিও বেড়েছে। গণভোটের জন্য অতিরিক্ত ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ অন্যান্য সরঞ্জাম প্রয়োজন। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের অনুকূলে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের মোট বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াবে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকায়। তুলনামূলকভাবে, ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের বাজেট ছিল ৭০০ কোটি টাকা, আর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় নির্ধারিত হয়েছিল।
অতিরিক্ত বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের অপ্রত্যাশিত খাত বা থোক বরাদ্দ থেকে দেওয়া হবে। অপ্রত্যাশিত খাত হলো জরুরি, আকস্মিক বা বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য রাখা একটি অর্থ, যা আগে থেকে কোনো প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট করা থাকে না। সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা বিশেষ উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থ ব্যবহার করা হয়। তবে এবারের বরাদ্দ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা উন্নয়ন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ জানিয়েছেন, নির্বাচন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাজেটের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ আগেই চূড়ান্ত হওয়ায়, নির্বাচন কমিশনের চাহিদা মেটাতে অন্য কোনো খাত থেকে অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। অপ্রত্যাশিত খাত থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরে এটি নির্বাচন কমিশনের অনুকূলে বাজেটে সমন্বয় করা হবে।


