আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদারে সোমালিয়ায় তুরস্কের এফ-১৬ মোতায়েন

আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদারে সোমালিয়ায় তুরস্কের এফ-১৬ মোতায়েন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সোমালিয়ায় এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে তুরস্ক। বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট তুর্কি কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে মোতায়েনের সময়কাল, বিমানসংখ্যা কিংবা নির্দিষ্ট ঘাঁটি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

সোমালিয়া তুরস্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে গৃহযুদ্ধের সূচনার পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তুরস্ক ধারাবাহিকভাবে সামরিক, মানবিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক এফ-১৬ মোতায়েনকে সেই দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমালিয়ায় এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে, তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, এই বিমানগুলো সোমালিয়ায় অবস্থানরত তুর্কি সামরিক কন্টিনজেন্টের কার্যক্রমে সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহৃত হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুদ্ধবিমানগুলো তুরস্কের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং সোমালি সেনা বা কর্মীরা এগুলো পরিচালনা করবেন না।

তুর্কি কর্মকর্তাদের মতে, এই মোতায়েন মূলত তুরস্কের নিজস্ব সামরিক সদস্য ও স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির সামরিক তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে তুরস্ক তাদের উপস্থিতি আরও সংগঠিত ও সুরক্ষিত করতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

২০১৭ সালে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে তুরস্ক তাদের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি উদ্বোধন করে। ওই ঘাঁটিটি সোমালি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোগাদিশুতে একটি পূর্ণাঙ্গ টাস্কফোর্স এবং একটি এয়ার কম্পোনেন্ট কমান্ড বজায় রেখেছে আঙ্কারা। এর মূল লক্ষ্য হলো সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সোমালিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

সোমালিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবের সহিংসতার মুখে রয়েছে। রাজধানী মোগাদিশু এবং আশপাশের এলাকায় গোষ্ঠীটি নিয়মিত বোমা হামলা ও সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে সোমালি সরকার আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহায়তায় নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা জোরদারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তুরস্ক সেই প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান অংশীদার।

এফ-১৬ মোতায়েনের আগে আঞ্চলিক রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে। তুরস্ক সম্প্রতি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে। আঙ্কারা একে সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেয় এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক সিয়াদ বারের পতনের পর সোমালিয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙনের মুখে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হয়। ওই সময়েই দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চল সোমালিল্যান্ড নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এই স্বাধীনতার স্বীকৃতি মেলেনি, তবুও অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসিতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

সোমালিল্যান্ডের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো, মুদ্রা, নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ রয়েছে। সাধারণভাবে অঞ্চলটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত হলেও কেন্দ্রীয় সরকার এখনো একে সোমালিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, মূল সোমালিয়া রাষ্ট্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো নাজুক, যেখানে আল-শাবাবের হামলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের এফ-১৬ মোতায়েন শুধু নিরাপত্তা সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে আঙ্কারার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতি ও প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিতও বহন করে। এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সোমালিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ