রাজনীতি ডেস্ক
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে শেরেবাংলা নগরের গণভবনের পাশের একটি ১৮ একর জমি চূড়ান্ত করেছে নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য স্থায়ী বাসভবন নির্মাণের জন্য। ইতোমধ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণপূর্ত অধিদপ্তর চূড়ান্ত নকশা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করতে চায়।
প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নতুন বাসভবন তৈরি হতে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগবে। এই সময়কালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যমুনা বা সংসদ ভবনসংলগ্ন স্পিকারের বাসভবন ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী স্পিকারের বাসভবনের সঙ্গে ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনও যুক্ত করা যেতে পারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেবেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে শেরেবাংলা নগরের ‘গণভবন’ ব্যবহৃত হতো। জুলাই ২০০১ সালের অভ্যুত্থানের পর এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। জাদুঘর নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন যে এলাকায় নির্মাণ করা হবে, সেখানে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের নকশায় কোনো ব্যত্যয় হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও স্থাপত্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ১৯৬২ সালে মার্কিন স্থপতি লুই আই কান শেরেবাংলা নগরের ২০৮ একর জমিতে সংসদ ভবনসহ পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলার নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ সালে তিনি নকশা চূড়ান্ত করেন, তবে সংসদ ভবন নির্মাণের আগে তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে কমপ্লেক্সের নকশা নানা ক্ষেত্রে প্রাথমিক নকশার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল রাখেনি। নির্বাচিত জমিতে লুই আই কানের নকশায় কী নির্দেশনা ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, তবে বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কমপ্লেক্সের আশপাশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান, হাসপাতাল, লেক, সবুজের সমারোহ ও প্রশস্ত সড়ক থাকার পরিকল্পনা ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়টি দেখভাল করতে গণপূর্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থাপত্য অধিদপ্তর, কারিগরি পেশাজীবী সংগঠন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞরা সদস্য হিসেবে রয়েছেন। কমিটির দুটি সভায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন স্থাপন এবং কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কোথায় থাকবেন, তা প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল।
কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য তিনটি সম্ভাব্য স্থান যাচাই করা হয়। এর মধ্যে গণভবনের পশ্চিম-উত্তর পাশে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সংলগ্ন ১৮ একর জমি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে চূড়ান্ত করা হয়। এই জমির একটি অংশে সরকারি কর্মচারীদের পুরনো কোয়ার্টার রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে উন্মুক্ত স্থান এবং আগারগাঁও-শ্যামলী সড়কের দক্ষিণ পাশে সংসদ ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পুরনো কোয়ার্টার ভেঙে বাসভবন নির্মাণের প্রস্তাব আসে।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, নির্বাচিত এলাকায় নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আগেভাগে নকশা তৈরি করে রাখতে চাই যাতে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে গণপূর্ত অধিদপ্তর কাজ শুরু করতে পারে। নতুন বাসভবনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রয়োজনীয় সব সুবিধা রাখা হবে। মূল ভবনটি তিনতলা হবে।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী ফিরোজ হাসান জানিয়েছেন, বহুতল ভবন না হওয়ায় দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে বাসভবন নির্মাণ সম্ভব।
গণভবনের ইতিবৃত্ত অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর এটি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলে বাস শুরু করেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তাকে এক টাকা প্রতীকী মূল্যে স্থায়ীভাবে বাসের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর বরাদ্দ বাতিল হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনা পুনরায় গণভবনে ওঠেন। ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে যাওয়ার দিন বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে আক্রমণ চালিয়ে লুটপাট ও ভাঙচুর করে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার এটি ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সংরক্ষণে নেয়।
জাদুঘর উদ্বোধনের বিষয়ে গত বছর এবং চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে তারিখ ঘোষিত হলেও কাজ শেষ না হওয়ায় উদ্বোধন সম্ভব হয়নি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছেন, চলমান সরকারের সময়েই জাদুঘরের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে।


