উত্তর ভারত মহাসাগরে ইরান-চীন-রাশিয়ার যৌথ নৌ মহড়া

উত্তর ভারত মহাসাগরে ইরান-চীন-রাশিয়ার যৌথ নৌ মহড়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌ মহড়া আয়োজন করতে যাচ্ছে। উত্তর ভারত মহাসাগরে অনুষ্ঠেয় এই মহড়ায় তিন দেশের নৌবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট অংশ নেবে। ইরানি গণমাধ্যম সূত্রে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি বেল্ট’ শীর্ষক এই যৌথ মহড়ায় ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নৌ ইউনিট অংশ নেবে। একই সঙ্গে এতে যুক্ত হবে চীন ও রাশিয়ার নৌবাহিনীর নির্ধারিত জাহাজ ও সহায়ক ইউনিট। মহড়ার লক্ষ্য হিসেবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, যৌথ অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় উন্নত করার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।

এই মহড়া উত্তর ভারত মহাসাগরের একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে, যা দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচিত। অঞ্চলটি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি বেল্ট’ মহড়ার সূচনা হয় ২০১৯ সালে ইরানের নৌবাহিনীর উদ্যোগে। এরপর থেকে নির্দিষ্ট বিরতিতে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এবং এবারের আয়োজনটি সপ্তমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পূর্ববর্তী মহড়াগুলোতে সামুদ্রিক টহল, উদ্ধার অভিযান, জাহাজ রক্ষা এবং সমন্বিত কৌশলগত মহড়ার মতো বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এবারের মহড়াতেও অনুরূপ কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

এই যৌথ নৌ মহড়ার সময় নির্বাচন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত এবং আলোচনার আহ্বান—এই দুই বিষয় একসঙ্গে সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর জবাবে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত ও কঠোর।

ইরানের অবস্থান হলো, তারা আলোচনার বিরোধী নয়; তবে যেকোনো সংলাপ হতে হবে ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে, কোনো ধরনের চাপ বা একতরফা শর্ত ছাড়া। এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তেহরান স্পষ্ট করেছে যে, সামরিক হুমকি বা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়।

চীন ও রাশিয়ার অংশগ্রহণ এই মহড়াকে কেবল একটি সামরিক অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। এই তিন দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যমূলক নীতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত। যৌথ মহড়ার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজেদের সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মহড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একে নিয়মিত সামরিক অনুশীলন হিসেবে উপস্থাপন করছে, তবু এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, উত্তর ভারত মহাসাগরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই যৌথ নৌ মহড়া শুধু সামরিক সহযোগিতার একটি অনুশীলন নয়; বরং চলমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইঙ্গিত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ