ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি, দেশটির পুলিশপ্রধানসহ মোট ১০ জন ব্যক্তি এবং একাধিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক দমনমূলক অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রেক্ষিতে সোমবার (২ জানুয়ারি) এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার থেকেই ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘ফারাজা’ এবং সংশ্লিষ্ট ১০ ব্যক্তি ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর আওতায় পড়বে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তদের মধ্যে ইরানের পুলিশপ্রধান ছাড়াও ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে সহিংস ও মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে থাকা বা যুক্তরাজ্যের অধিক্ষেত্রভুক্ত সব ধরনের সম্পদ জব্দ করা হবে। পাশাপাশি তাদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ ও ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আওতাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপের আগে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রও পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি এবং তেহরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারির ঘোষণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চলতি মাসে ইরানে পরিচালিত নিরাপত্তা অভিযানের সামগ্রিক তত্ত্বাবধান মোমেনির হাতে ছিল এবং তার অধীনস্থ বাহিনীগুলো শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এসব অভিযানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে হতাহতের ঘটনাও রয়েছে। এ ছাড়া একই ঘোষণায় আরও পাঁচজন ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব কর্মকর্তা সরাসরি বিক্ষোভ দমন ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন।

নিষেধাজ্ঞার পরিধি শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ইরানি বিনিয়োগকারী বাবাক জানজানি এবং যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দুটি ডিজিটাল সম্পদ বিনিময় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন ট্রেজারির অভিযোগ, এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছিল।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো, অবৈধ অর্থপ্রবাহ এবং সাইবার অপরাধে অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তার মতে, ডিজিটাল সম্পদের অপব্যবহার করে যারা রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অর্থ জোগান দিচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রাখাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।

এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর পটভূমিতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিতে শুরু হওয়া এসব বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নেয় তেহরান। পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তবে ইরান সরকার বরাবরের মতো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার যুক্তি তুলে ধরেছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে দমনমূলক অভিযানের প্রেক্ষাপটে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান এবং পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়। তবে এসব চাপের মধ্যেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরান সরকারের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ