অর্থনীতি প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক একটি অর্থনৈতিক অবস্থা রেখে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে নড়বড়ে হয়ে পড়া অর্থনীতি গত দেড় বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে রাজস্ব আহরণ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, অর্থনীতির কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজার পরিস্থিতি, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থের প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি এসেছে। এর ফলে পরবর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় একটি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পাবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে বলে স্বীকার করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে গ্রহণ করা অনেক প্রকল্পকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করে বন্ধ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বন্ধ হওয়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থান কিছুটা কমে গেছে। এই পরিস্থিতি আগামী সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি ভবিষ্যতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
পে স্কেল সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান নিশ্চিত করে গেছে। তিনি জানান, এই সিদ্ধান্ত এমনভাবে নেওয়া হয়েছে যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে তা পরিবর্তন করতে না পারে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্গঠনের ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কর্মীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য গণভোটের জন্যও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, এই বরাদ্দ কোনো নির্দিষ্ট ভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য নয়। গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক ব্যয় বিবেচনায় রেখেই এই অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি জানান, গণভোটের সম্ভাবনা যুক্ত হওয়ায় এবারের নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার দাবি আংশিকভাবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ফল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষার মতো বিষয়গুলোও অর্থনৈতিক চিত্রে প্রভাব ফেলেছে। তবে কর্মসংস্থান হ্রাস ও বিনিয়োগের গতি মন্থর হওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচিবালয়ের বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি ভিত্তি রেখে যেতে চেয়েছে, যার ওপর পরবর্তী সরকার তাদের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারবে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।


