আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ব্যাপকভাবে স্থগিত করায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে একদল নাগরিক অধিকার সংগঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন নাগরিক। তাঁদের অভিযোগ, নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত অভিবাসন আইন ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার পরিপন্থী এবং কার্যত জাতীয়তা-ভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করছে।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা আফগানিস্তান, সোমালিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের ওপর প্রযোজ্য। নীতিটির আওতায় এসব দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসার আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত বা স্থগিত করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব দেশ থেকে আগত অভিবাসীরা ‘অগ্রহণযোগ্য হারে’ মার্কিন কল্যাণ সুবিধা গ্রহণ করেন, সেসব দেশের ক্ষেত্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তবে সোমবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত ফেডারেল আদালতে দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই নীতি বাস্তবে জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈধ অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। এর ফলে পরিবারভিত্তিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত অধিকার থেকে বহু মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। মামলায় আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন কখনোই কাউকে কেবল অতীতে বা ভবিষ্যতে নগদ নয় এমন সরকারি সহায়তা বা বেসরকারি দাতব্য সহায়তা গ্রহণের সম্ভাবনার কারণে অযোগ্য ঘোষণা করেনি। বরং এ ধরনের সাময়িক সহায়তাকে অভিবাসীদের সামাজিক একীভূতকরণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
মামলাকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তাঁদের দাবি, পুরো একটি দেশের নাগরিকদের সমষ্টিগতভাবে ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা আইনি ও বাস্তব—দুই দিক থেকেই অযৌক্তিক। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত অধিকাংশ দেশের জনসংখ্যা ইউরোপের বাইরে এবং সেগুলোর নাগরিকরা প্রধানত অ-শ্বেতাঙ্গ, যা নীতিটির বৈষম্যমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই মামলাটি দায়ের করেছে ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল’ সেন্টার, ডেমোক্রেসি ফরওয়ার্ড এবং দ্য লিগ্যাল এইড সোসাইটিসহ একাধিক নাগরিক অধিকার ও আইনি সহায়তামূলক সংগঠন। বাদীদের মধ্যে এমন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন, যাঁরা দাবি করেছেন যে এই নীতির কারণে তাঁরা তাঁদের স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা নিকটাত্মীয়দের থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
মামলায় একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে কলম্বিয়ার একজন চিকিৎসক ও এন্ডোক্রিনোলজিস্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ‘অসাধারণ দক্ষতা’সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রথম অগ্রাধিকার অভিবাসী ভিসায় অনুমোদন পান। তবে কলম্বিয়া নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাঁকে জানানো হয়, তিনি আর ওই ভিসার জন্য যোগ্য নন। মামলাকারীদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে, অভিবাসন ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গড় হিসেবে অভিবাসীরা দেশজ মার্কিন নাগরিকদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হারে কল্যাণ সুবিধা ব্যবহার করেন। গবেষণায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে, এমন প্রবণতা অস্বাভাবিক নয়, কারণ অনেক অভিবাসীর কল্যাণ সুবিধায় আইনি প্রবেশাধিকার সীমিত এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসীরা সাধারণত ইতিবাচকভাবে নির্বাচিত হন।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, পূর্ববর্তী এক বিবৃতিতে দপ্তরটি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যে নতুন অভিবাসীরা সরকারি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে না, ততদিন এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। তবে মামলাকারীদের দাবি, সরকার যদি বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যক্তিভিত্তিক মূল্যায়ন করে, তাহলে জাতীয়তার ভিত্তিতে এমন সার্বিক স্থগিতাদেশ আরোপের প্রয়োজন পড়ে না।
মামলার শুনানি ও আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে এখন দৃষ্টি রয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিক, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তাঁদের পরিবার এবং অভিবাসন নীতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের।


