রাজনীতি ডেস্ক
বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাকেই রাজনৈতিকভাবে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করে বিএনপি—এমন অবস্থানের কথা জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার এক বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বিবেচনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি রাজনৈতিক আলোচনায় উপযোগী নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সব ধর্মাবলম্বীর অধিকার ও নিরাপত্তা সমভাবে নিশ্চিত করা।
সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ মুসলমান। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সব ধর্মের মানুষের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নয়, বরং নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মূল বিষয়।
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে দলের মহাসচিব দাবি করেন, এ ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক রেকর্ড ইতিবাচক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তবে সেগুলো মূলত রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত, সাম্প্রদায়িক কারণে নয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিচয়ের কারণে অনেক সময় সংঘর্ষ বা হামলার ঘটনা ঘটে, যেগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই প্রসঙ্গে তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন এবং সে কারণে তিনি সহিংসতার শিকার হন, তাহলে সেটিকে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধ থেকেই এসব ঘটনার উৎপত্তি হয় এবং সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন নয়।
সাক্ষাৎকারে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের (২০০১–২০০৬) সময়কাল নিয়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে ওই সময়কে সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল—এমন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল তা নাকচ করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি এমন কোনো মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন এবং তাঁর জানা মতে এ ধরনের মূল্যায়ন নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন জরিপ ও পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করা হলে বিএনপির মহাসচিব সেগুলোকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু পক্ষ এই ধরনের তথ্য উপস্থাপন করছে, যা বাস্তব পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে না। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সহিংসতার প্রকৃতি না বুঝে এ ধরনের মূল্যায়ন করা হলে তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারেক রহমান ইতিমধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এসব পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার রয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দলের নেতৃত্ব জনগণের কাছে স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ভবিষ্যৎ সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে কাজ করবে। তিনি দাবি করেন, দলের ঘোষিত পরিকল্পনায় দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার চরিত্র নিয়ে বিএনপির অবস্থান বিদ্যমান রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে। এসব বিষয়ে দলটির দৃষ্টিভঙ্গি আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


