রাজনীতি ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহারটি প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন—এই প্রধান খাতগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো উপস্থাপন করা হয়েছে। বিএনপি বলছে, ইশতেহারের লক্ষ্য হচ্ছে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথনির্দেশ দেওয়া।
ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার, সাংবিধানিক সংস্কার, জাতীয় ঐক্য জোরদার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, পুলিশ ব্যবস্থার সংস্কার এবং শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি মনে করছে, এসব সংস্কার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি ও কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। এখানে দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নারী ক্ষমতায়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি, শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রবাসী কল্যাণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার, শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে সরকারি আয়ের কাঠামো টেকসই করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এতে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি, পরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন খাতের উন্নয়ন, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা গঠনের উদ্যোগ এবং পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দলটি বলছে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে সমগ্র দেশের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ইশতেহারের পঞ্চম ও শেষ অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা, পাহাড় ও সমতলের জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, ক্রীড়া অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা প্রসার এবং সামাজিক নৈতিকতা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপির এই ইশতেহার ঘোষণাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভোটারদের কাছে দলটির নীতিগত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


