আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী পরিবেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সংস্কারপন্থি, সামরিক-সমর্থিত রক্ষণশীল ও জনতাবাদী—এই তিন ধারার রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একই সঙ্গে ভোটগ্রহণের দিনেই ২০১৭ সালে প্রণীত সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে থাইল্যান্ডজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আগাম ভোটগ্রহণ পর্বে ইতোমধ্যে ২২ লাখের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এবারের নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ।
থাইল্যান্ডের এই সাধারণ নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতিতে রয়েছে। পর্যটন ও রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালালেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করেছে।
নির্বাচনে ৫০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। তবে সংগঠন, প্রচার ও জনসমর্থনের দিক থেকে কয়েকটি দলই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পিপলস পার্টি, ভূমজাইথাই এবং ফেউ থাই—এই তিনটি দল দেশব্যাপী শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাওয়ার সম্ভাবনাও তাদেরই বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে নির্বাচন-পূর্ব বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ৫০০ আসনের সংসদে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। ফলে নির্বাচন শেষে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।
থাইল্যান্ডের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটেই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। এ কারণে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কোন দল বা জোট সরকার গঠন করবে এবং প্রধানমন্ত্রী পদে কে আসবেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য জোট গঠনে আদর্শগত পার্থক্য, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংবিধান পরিবর্তন প্রশ্নে গণভোট। ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে, ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনী প্রণীত সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তন করা হবে কি না। গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, বর্তমান সংবিধান সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রভাবকে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থায়ী করেছে। তাদের মতে, নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হলে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা বাড়বে।
অন্যদিকে রক্ষণশীল ও সামরিক-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর আশঙ্কা, সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তারা মনে করে, দ্রুত বা ব্যাপক পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। ফলে গণভোটের ফলাফল শুধু সংবিধান সংস্কারের দিকনির্দেশনাই নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক ভারসাম্য নির্ধারণেও ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডে এবারের নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। সে সময় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। এই আগাম নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সার্বিকভাবে, সাধারণ নির্বাচন ও সংবিধান পরিবর্তন প্রশ্নে গণভোট—এই দুই প্রক্রিয়ার ফলাফল থাইল্যান্ডের আগামী দিনের রাজনৈতিক কাঠামো, শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।


