রাজনীতি ডেস্ক
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের একটি ব্যতিক্রমী সামাজিক বাস্তবতা আবারও আলোচনায় এসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে সক্রিয় হলেও এই ইউনিয়নের নারীরা দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে কোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। প্রতিবারের মতো এবারও তাদের ভোটকেন্দ্রে আনতে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা বাজারে যাওয়া, কেনাকাটা, চাকরি-বাকরি, শিক্ষা গ্রহণসহ সামাজিক ও পারিবারিক নানা কাজে অংশ নেন। তবে ভোটের দিন এলে তারা ঘরের বাইরে যান না। দেশের অন্যান্য এলাকায় যেখানে ভোটকেন্দ্রে নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়, সেখানে এই ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্রগুলোতে কেবল পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ফলে এত বছর ধরে নারীদের ভোটগ্রহণ কার্যত অনুপস্থিত রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রথার সূত্রপাত ১৯৬৯ সালে। সে সময় ভারতের জয়নপুর থেকে আগত পীর মওদুদ হাসান জয়নপুরী (রহ.) ওই এলাকায় অবস্থান করেন। তখন দেশে কলেরার প্রাদুর্ভাব ছিল। কথিত আছে, ওই প্রেক্ষাপটে তিনি নারীদের পর্দা রক্ষা এবং ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। যদিও এই নির্দেশনার লিখিত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে মহামারি শেষ হলেও ওই নির্দেশ সামাজিক রীতিতে পরিণত হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা অনুসৃত হয়ে আসছে।
নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট না দেওয়ার বিষয়টি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল নয়। পারিবারিক চাপ, সামাজিক অনুশাসন এবং পীরের আদেশ অমান্য করলে সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা তাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করেছে। অনেক নারী জানান, ভোটের দিন তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরে অবস্থান করেন। কেউ কেউ বলেন, পুরুষ সদস্যরা সরাসরি বাধা না দিলেও সামাজিক পরিবেশের কারণে তারা ভোট দিতে সাহস পান না।
একাধিক নারী ভোটার জানান, পীরের আদেশ অমান্য করলে অমঙ্গল হতে পারে—এমন বিশ্বাস এখনও অনেকের মধ্যে বিদ্যমান। ফলে কেউ কেউ অনুরোধ পেলেও নিজের ইচ্ছায় ভোট দিতে যান না। এই ভয় ও সামাজিক চাপে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে সীমিত রয়েছে।
নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ১০ হাজার ২৯৯ জন। এত বিপুলসংখ্যক নারী ভোটার থাকা সত্ত্বেও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ না করার কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য এবং উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সবাই পুরুষ ভোটারদের ভোটেই নির্বাচিত হয়েছেন।
সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড সদস্য হাজেরা বেগম বলেন, সময়ের সঙ্গে সমাজে পরিবর্তন এসেছে। এখন নারীরা আগের তুলনায় বেশি সচেতন। অনেক নারী ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তিনি মনে করেন, নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত হলে স্থানীয় নেতৃত্ব ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নারীদের ভোটে অংশগ্রহণ বাড়াতে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নারীদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করছেন। গত বুধবার রূপসা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ এলাকায় ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিনি বলেন, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্দা মেনে ভোট দেওয়া কোনো নিষিদ্ধ বা অপরাধমূলক কাজ নয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীদের মধ্যে থাকা ভয় ও সংশয় দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
চাঁদপুর-৪ আসনে এবারের সংসদ নির্বাচনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি প্রার্থী মো. হারুনুর রশীদ বলেন, ভোট দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। নারীরা ভোটকেন্দ্রে এলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে। তিনি জানান, এলাকায় আস্থা তৈরির জন্য নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, ইসলামে নারীদের ভোট দেওয়া নাজায়েজ বা নিষিদ্ধ—এমন কোনো বিধান নেই। নারীদের ভোটকেন্দ্রে আনতে তাঁর দলও চেষ্টা চালাচ্ছে। দলের নারী কর্মীরা ইতোমধ্যে এলাকায় একাধিক উঠান বৈঠক করেছেন।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রথা ভেঙে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন কি না, তা নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়, তা নির্ধারণ করবে এই ব্যতিক্রমী অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দিকনির্দেশনা।


