রাজনীতি ডেস্ক
জেনারেশন জি তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বিরাজ করছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, কৌতূহল ও প্রত্যাশা। তবে যে গণতান্ত্রিক সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে লাখো তরুণ রাজপথে নেমেছিল, নির্বাচনী বাস্তবতায় তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে—তা নিয়ে প্রশ্ন ও হতাশাও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশব্যাপী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। সরকারি দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। আহত হন আরও বহু মানুষ। এই সহিংসতা দেশি-বিদেশি মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেনাবাহিনীর একাংশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরপরই রাজনৈতিক সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। আগস্ট মাসে আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করলে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।
পরবর্তী সময়ে গত নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বর্তমানে তাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশ সরকার তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। এতে সরাসরি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দলটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনিই নির্বাচনের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় সক্রিয় হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মুখে ছিল। এবারের নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণকে কেউ কেউ রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জামায়াতে ইসলামী এবার কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি, যা নারী প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও প্রত্যাশিত জনসমর্থন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের ঘোষণা দিলে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা দেখা দেয়। আন্দোলনের সময় যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংস্কারপন্থী রাজনীতির কথা বলা হয়েছিল, এই জোটকে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সহিংস ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদীয় রাজনীতিতে অবস্থান অনেক দলের কাছে নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে, আন্দোলনের মাধ্যমে যে আদর্শিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ তা পূরণ করতে পারছে না।
সব অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের মধ্যেও পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে অবাধ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে ঢাকার রাজপথসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল ও সতর্ক প্রত্যাশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে এই নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী সরকার কতটা গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবি—গণতান্ত্রিক সংস্কার, আইনের শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি—বাস্তবায়নে সক্ষম হয় তার ওপর।


