আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক সাক্ষাৎকারে ভিনগ্রহী প্রাণ বা এলিয়েনের অস্তিত্বকে ‘বাস্তব’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এ ধরনের প্রাণ কোথায় রয়েছে সে বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই এবং প্রচলিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সঙ্গে তিনি একমত নন। শনিবার প্রকাশিত এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি।
ইউটিউবভিত্তিক এক আলোচনায় এলিয়েনের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে ওবামা বলেন, “তারা বাস্তব,” তবে সঙ্গে সঙ্গে তিনি যোগ করেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো এলিয়েন দেখেননি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত কথিত গোপন সামরিক ঘাঁটি Area 51-এ এলিয়েনদের রাখা হয়েছে—এমন বহুল প্রচলিত ধারণাকে তিনি নাকচ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে এ ধরনের কোনো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা বা গোপন বন্দিশালা নেই; যদি না তা এমন কোনো বিশাল ষড়যন্ত্র হয় যা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়েছে।
এরিয়া ৫১ দীর্ঘদিন ধরেই অশনাক্ত উড়ন্ত বস্তু (ইউএফও) ও ভিনগ্রহী সংক্রান্ত নানা গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। পরবর্তীতে এটি উন্নত সামরিক বিমান ও প্রযুক্তি পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবুও ঘাঁটিটিকে ঘিরে জনমনে কৌতূহল ও জল্পনা অব্যাহত রয়েছে।
ওবামার মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন অশনাক্ত অস্বাভাবিক ঘটনা বা ইউএপি (Unidentified Aerial Phenomena) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউএফওর পরিবর্তে সরকারি মহলে বর্তমানে ইউএপি পরিভাষাটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ঘটনার তদন্তে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি বিশেষ দপ্তর—All-domain Anomaly Resolution Office—প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেস সরকারকে এ-সংক্রান্ত তথ্য অধিকতর স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশে বাধ্য করতে আইন পাস করেছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য সংকেত অনুসন্ধান করছেন। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি উদ্যোগ ছিল ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া SETI@home প্রকল্প। এটি ছিল গণঅংশগ্রহণমূলক বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি, যেখানে বিশ্বব্যাপী স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের কম্পিউটারের অব্যবহৃত প্রসেসিং ক্ষমতা ব্যবহার করে মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করেন।
প্রকল্পটির মূল তথ্যসূত্র ছিল পুয়ের্তো রিকোর Arecibo Observatory-এর বিশাল রেডিও দূরবীন থেকে সংগৃহীত উপাত্ত। লক্ষ্য ছিল অস্বাভাবিক রেডিও সংকেত শনাক্ত করা, যা সম্ভাব্যভাবে ভিনগ্রহী বুদ্ধিমত্তার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে ২০২০ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দূরবীনটি ধসে পড়ে এবং প্রকল্পটির কার্যক্রম কার্যত সমাপ্ত হয়।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২১ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণে ১২ বিলিয়নেরও বেশি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত শনাক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রায় ১০০টি সম্ভাবনাময় প্রার্থী সংকেত চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে এসব সংকেত পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে চীনের FAST radio telescope ব্যবহার করে। গবেষকরা ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখছেন, এগুলোর কোনোটি প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎসের বাইরে অন্য কিছুর ইঙ্গিত দেয় কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিনগ্রহী প্রাণের প্রশ্নটি এখনো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। জনপরিসরে উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তিদের মন্তব্য বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় আনলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পরীক্ষণযোগ্য প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর। ফলে এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কৌতূহল বাড়লেও, এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা ও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।


