আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে, এমন তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেরিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বৈঠক ও অঞ্চলজুড়ে সামরিক শক্তি মোতায়েনকে ঘিরে পরিস্থিতি দ্রুত সীমিত সংঘাত থেকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত এই অভিযান শুধুমাত্র আক্রমণাত্মক প্রয়াসের সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি হতে পারে কয়েক সপ্তাহ ব্যাপী, বড় মাত্রার অপারেশন, যা পূর্বের সীমিত অভিযানের তুলনায় অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক হবে। সম্ভাব্য এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে পারে ইসরায়েল; যৌথভাবে তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পরিকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুকে লক্ষ্য করে মিসাইল ও বিমান হামলা চালাতে পারে। এর ফলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সরকারের স্থিতিশীলতার উপর তা দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা রক্ষায় গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৩ সালের মধ্যেই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘটিত নৈরাজ্য ১২ দিনের সংকট উভয় পক্ষের সমর্থক শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ তৈরি করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ ছিল। এ ঘটনাগুলো পূর্ববর্তী উত্তেজনার মাত্রা ও কৌশলগত অবস্থানের পটভূমি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার পটভূমিতে গত মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতরা প্রায় তিন ঘণ্টা ব্যাপী কূটনৈতিক আলোচনা করেন। এই বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে ঘোষিত অবস্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ শর্তে অস্বীকৃতি। এর ফলে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি সামরিক বিকল্পের দিকে আরও ঝুঁকছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ভূমিকা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইসরায়েল গত একাধিক বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি প্রতিরোধে জোর দেন এবং ইরানের এই কর্মসূচিকে নিজের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে মনে করে আসছে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করছেন, যদি আন্তর্জাতিক সমাজ ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ইরানের কর্মসূচি থামাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কঠোর সামরিক বিকল্প বিবেচনা করা জরুরি হবে। এই অবস্থান থেকে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার সামরিক পদক্ষেপ নিতে চাপ দিচ্ছে, এমন তথ্য কূটনৈতিক পর্যায়ের ক্রমবর্ধমান রিপোর্টে পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি বর্ধিত হয়েছে, যা ইরানবিরোধী কার্যক্রমকে সহজ করার পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। আমেরিকার রণতরী ও বিমান বাহিনী ঘাঁটিতে জোরদার অবস্থান ইরান বিরোধী সম্ভাব্য অপারেশনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে; তবে এটি কি কেবল প্রতিরক্ষামূলক মনোভাব নাকি আক্রমণাত্মক অভিযানের সূচনা, তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রক্ষণশীল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশে যুদ্ধের সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, যদি কূটনৈতিক চাপ ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিকল্প হতে পারে নিয়ন্ত্রিত আক্রমণ বা পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান, যার মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থায়ী হতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষকরা সতর্ক করছেন, ইরানবিরোধী যেকোনো বড় সামরিক অভিযান হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করবে। তেল রফতানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মূল্যবৃদ্ধি—all ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি, অঞ্চলের বিভিন্ন অনুপ্রভাবশালী শক্তি যেমন হিজবুল্লাহ, ইরাক ও সিরিয়ার প্রoxid নেতারা এই উত্তেজনাকে আরও জটিল রূপ দিতে সক্ষম।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল জোরালোভাবে বলছে যে সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে বাস্তবতায় যদি পরিস্থিতি আরও তীব্র হয় এবং কূটনৈতিক চেষ্টায় গতি না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে পারে, এমনই শঙ্কা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশ করা হচ্ছে।


