অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেওয়া ৯ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণের মধ্যে বড় অংশ পরিচালনা ব্যয় মেটানো এবং সরকারি সেবা প্রদানে ব্যবহার হয়েছে। অর্থনীতি সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইআরডি (Economic Research Department) এই তথ্য উদ্ভাসিত করেছে।
প্রতিবেদনের অনুযায়ী, নেওয়া ৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ছিল পরিচালনা ব্যয়, যা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন, প্রশাসনিক খরচ এবং অন্যান্য চলতি ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়েছে। বাকী ৪ বিলিয়ন ডলার মূলত সাধারণ সরকারি সেবা এবং বাজেট সহায়তায় ব্যয় হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বিদেশি ঋণ ব্যবহার করে প্রশাসনিক খরচ মেটানোর প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলছেন এবং এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
ইতিহাসে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বিদেশি ঋণের বাজেট সহায়তার মাধ্যমে ব্যয় করা পরিমাণ প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর মধ্যে ৪ বিলিয়ন ডলার ইউনূস সরকারের সময়ে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারের মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১৯ শতাংশ। যদিও এই ঋণের পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ সম্প্রতি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এবং ঋণ ফাঁদ এড়াতে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ এই প্রসঙ্গে বলেন, “সরকার মূলত এনুয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের জন্য কনজারভেটিভ অবস্থান নিয়েছিল। ওই সময়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণের একটি বড় অংশ বাজেট সহায়তার মাধ্যমে এসেছে। এর ধারাবাহিকতায় আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে বাজেট সহায়তার চুক্তি করেছি।”
তিনি আরও জানান, “এই প্রক্রিয়ার ফলে প্রায় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার সরকারের ব্যয় ছাড় হয়েছে। সরকারের হাতে নগদ তহবিল সীমিত ছিল, তবে এটি মূলত ফরেন রিজার্ভকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা এবং বাজেটের কার্যকর ব্যবস্থাপনার কারণে ছিল।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলতি ব্যয় মেটাতে বিদেশি ঋণের ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রভাবিত করতে পারে। তারা সতর্ক করেছেন যে, যদি এই ধরনের ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়মিত ধারা হয়ে যায়, তবে এটি দেশের ঋণপরিধি বৃদ্ধি এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
অর্থনীতিবিদরা সরকারের জন্য সুপারিশ করেছেন, ভবিষ্যতে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। বাজেট সহায়তার মাধ্যমে পরিচালনাগত ব্যয় মেটানো সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সুবিধাজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের ঋণ শোধের সক্ষমতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাদের মতে, ফরেন রিজার্ভ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রকল্পের বাইরে থেকে ঋণ ব্যবহার সীমিত করা, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রয়োগ করা অপরিহার্য। এছাড়া, ঋণের প্রাপ্তি ও ব্যবহার সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ করা দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য দায়িত্বশীলতার সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


