রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এর আওতায় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা, ধর্মীয় সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ কয়েকটি অগ্রাধিকার খাতে তাৎক্ষণিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার একাধিক বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা ইতোমধ্যে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিকল্পনার বিস্তারিত জমা দিতে শুরু করেছেন।
এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ১০ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদান কর্মসূচি’ উদ্বোধন করেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে দেশের নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য এই কার্ড বিতরণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৭ হাজার নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
সরকার কৃষি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ ছাড়া ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী প্রদানের কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। আজ শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী প্রদান কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যেও একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। একই দিনে দেশের আরও ৫৪টি জেলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি উদ্বোধন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খাল খননের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকারের পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতেও নতুন উদ্যোগ রয়েছে। খুব শিগগিরই ‘হেলথ কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এর মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি সম্পর্কে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর। তবে এর মধ্যে যেসব কর্মসূচি সরাসরি জনগণের কল্যাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, খাল খনন কর্মসূচি এবং সামাজিক সুরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদান করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সব নারীপ্রধান পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাধারণত সরকার গঠনের পর প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। তবে বর্তমান সরকার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন ঈদ উপলক্ষে মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নির্বাচনের আগে দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র সংস্কার এবং উন্নয়নসংক্রান্ত যে কর্মসূচি উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার আলোকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দুর্নীতির বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে দলটি এককভাবে ২১১টি আসনে জয়লাভ করে। এর পাঁচ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তাঁর সঙ্গে ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন। পরে ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়, যেখানে মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।


