আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে বৃহস্পতিবার ভোরে ৭.৪ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ঢেউ ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে কমপক্ষে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সুলাওয়েসি ও মালুকু দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী মলুকা সাগরে, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত। অগভীর এই ভূমিকম্পের কারণে কম্পন ব্যাপক এলাকায় অনুভূত হয় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর সুলাওয়েসি প্রদেশের মানাদো শহরে একটি ভবন ধসে একজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানান, নিহত ব্যক্তি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েন। এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়।
ভূমিকম্পের পরপরই হাওয়াইভিত্তিক প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার সতর্কতা জারি করে জানায়, কেন্দ্রস্থল থেকে এক হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়ার উপকূলে বিপজ্জনক সুনামি ঢেউয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে ঝুঁকি কমে আসায় দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-ভৌতিক সংস্থা জানায়, ভূমিকম্পের প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে সুলাওয়েসি দ্বীপের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ঢেউ আঘাত হানে। উত্তর মিনাহাসা অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৭৫ সেন্টিমিটার উচ্চতার ঢেউ রেকর্ড করা হয়। এছাড়া বিটুং এলাকায় ২০ সেন্টিমিটার এবং উত্তর মালুকু প্রদেশে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার উচ্চতার ঢেউ লক্ষ্য করা গেছে। এসব ঢেউ সীমিত উচ্চতার হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
ভূমিকম্পের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তেরনাতে বসবাসকারী এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কম্পন এক মিনিটেরও বেশি সময় স্থায়ী ছিল এবং শুরুতে ঘরের দেয়াল কাঁপতে থাকার শব্দ শোনা যায়। পরবর্তীতে আশপাশের লোকজন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
মূল ভূমিকম্পের পর অন্তত ১১টি পরাঘাত বা আফটারশক অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৫.৫। এসব পরাঘাতের কারণে কিছু এলাকায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ অব্যাহত থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে সাময়িকভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ইন্দোনেশিয়ার কিছু উপকূলীয় এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত সুনামি ঢেউ আঘাত হানতে পারে। পাশাপাশি ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও জাপানসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশে ছোট আকারের ঢেউয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি এবং উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাবও দেখা যায়নি।
ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়া ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষজনিত কারণে প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এ কারণে দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং নিয়মিতভাবে ভূমিকম্পজনিত সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে আচেহ প্রদেশে ৯.১ মাত্রার এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও পরবর্তী সুনামিতে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষয়ক্ষতি ঘটালেও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অঞ্চলের ঝুঁকি ও প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে।


