আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন জোট, বিরোধী দল এবং সামরিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এই চুক্তিকে ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ইসরায়েল আলোচনার বাইরে ছিল, যা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চুক্তির ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা প্রকাশ্যে সমালোচনা শুরু করেন। কট্টর ডানপন্থী ওজমা ইয়েহুদি পার্টির সংসদ সদস্য সভিকা ফোগেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন, যা পরবর্তীতে তিনি মুছে ফেলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ইসরায়েলি রাজনীতিকদের হতাশা ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
ইসরায়েলের প্রধান বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ চুক্তিটিকে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইসরায়েলকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইসরায়েলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
লাপিদ আরও অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ শুরুর সময় যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। তার মতে, কৌশলগত পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার ঘাটতির কারণে দেশটি প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে।
ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ইয়ার গোলানও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের মাধ্যমে যে নিরাপত্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তার মতে, সংঘাতের ৪১ দিন পরেও ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং ইরান পূর্বের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা অ্যাভিগডোর লিবারম্যানও চুক্তির সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বর্তমান সমঝোতা ভবিষ্যতে আরও জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে ইসরায়েলকে আরও কঠিন শর্তে নতুন করে সংঘাতে জড়াতে হতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকরাও চুক্তি নিয়ে সমালোচনামুখর অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয় একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েল সরকারের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সমন্বয়ের অভাব দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষক অ্যাভি আশকেনাজি এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পর এই যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে। তার মতে, এই চুক্তি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষক আমোস হারেল মনে করেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করার কৌশল ভবিষ্যতে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সার্বিকভাবে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দেশটির ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশল ও নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


