আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দফার আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়নি, ফলে অঞ্চলজুড়ে নাজুক যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক আশাবাদ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তান ত্যাগের সময় জানান, ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে একটি চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। তার ভাষায়, প্রস্তাবটি সহজ ও সুস্পষ্ট, এবং এখন সিদ্ধান্ত ইরানের ওপর নির্ভর করছে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানান, তেহরান আলোচনায় একটি গঠনমূলক প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তার মতে, এই দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, যা সমঝোতার পথে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
আলোচনার ব্যর্থতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আবার অস্থিতিশীল হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও তেল-গ্যাস অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে অনিশ্চয়তা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে একই সময়ে কিছু আঞ্চলিক অগ্রগতির ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের পূর্ব–পশ্চিম প্রধান তেল পরিবহন পাইপলাইন পুনরায় চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি কাতার উপসাগরীয় নৌপরিবহন ব্যবস্থায় কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে, যা সাময়িকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্বস্তি আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনার আয়োজক দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যতেও দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে আলোচনায় প্রধান মতবিরোধের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। ইরান এ দুই ইস্যুতে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে বলে জানা যায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয়ে কঠোর শর্ত আরোপ করে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দুই পক্ষই দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। চলমান উত্তেজনার সূচনা ঘটে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের পর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে এবং তা দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি হয়।
হরমুজ প্রণালী, যার মাধ্যমে বিশ্বের একটি বড় অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, সেটি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান আরও জটিলতা সৃষ্টি করেছে। এই নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পক্ষের সামরিক উপস্থিতি ও টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা প্রণালী এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর কিছু ইউনিট মোতায়েন করেছে। তবে ইরান এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে সতর্ক করেছে যে, কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ হলে তার প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
লেবানন পরিস্থিতিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। সেখানে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের কারণে মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
এদিকে ইসরাইল জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, পক্ষগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী সমঝোতা অর্জন এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে। ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার উভয়ই সতর্ক পর্যবেক্ষণে রয়েছে।


