মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক চাপের মুখে ফেলেছে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ইউএনডিপির প্রশাসক ও বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু জানিয়েছেন, চলমান সংঘাত বৈশ্বিক উন্নয়ন অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটানো জনগোষ্ঠী আবার নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ছে, যা বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানে হামলার পরবর্তী ছয় সপ্তাহে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয়ে। ফলে সার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি খাতে চাপ তৈরি হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্য বাড়তে থাকলে তা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক আয় ৮ দশমিক ৩০ ডলারের নিচে হলে তা দারিদ্র্যসীমার অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাবের ভিত্তিতে ইউএনডিপি জানিয়েছে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রসহ মোট ৩৭টি জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সংকট মোকাবেলায় ইউএনডিপি স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলারের নগদ সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করলে তা দ্রুততম সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।

তবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত দেশগুলো সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন সহায়তা কমিয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে এসব দেশের মোট উন্নয়ন সহায়তা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে ১৭৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আলেকজান্ডার ডি ক্রু আরও বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অভিযোজন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার মতে, উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও খাদ্য বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ