রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ: এক সপ্তাহে মৃত্যুহীন হলেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ: এক সপ্তাহে মৃত্যুহীন হলেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ডেস্ক

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে গত এক সপ্তাহে নতুন করে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘ সময় পর মৃত্যুহীন একটি সপ্তাহ পার হওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের জন্য স্বস্তির বার্তা দিলেও, নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা হিমশিম খাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

হাসপাতালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত সাত দিনে মোট ১০৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১২১ জন। তবে সপ্তাহের শুরুতে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও, সপ্তাহের শেষার্ধ থেকে পুনরায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে গত ২ মে’র তথ্যে দেখা যায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে ২১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, যার বিপরীতে ছাড়পত্র পেয়েছেন মাত্র চারজন। এতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩১ জনে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ।

হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত দৈনিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১২০ থেকে কমে ১০৯ জনে নেমে এসেছিল। কিন্তু ২৯ এপ্রিল থেকে সংক্রমণ পুনরায় বাড়তে শুরু করে। সেদিন চিকিৎসাধীন রোগী ছিল ১১৩ জন, যা ৩০ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ জনে। ১ মে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে ১১৪ জন হলেও ২ মে তা এক লাফে ১৩১ জনে উন্নীত হয়। এই আকস্মিক বৃদ্ধি স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণের তীব্রতা নির্দেশ করছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রামেক হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট ৮৯৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা ও সংক্রমণের তীব্রতায় এ পর্যন্ত ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং উন্নত চিকিৎসা সেবার কারণে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। দীর্ঘ সাত দিন কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটায় চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠলেও সংক্রমণের শেকল ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাধীন ১৩১ জন রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নতুন করে ২১ জন ভর্তির বিপরীতে ছাড়পত্র পাওয়ার হার কম হওয়ায় শয্যা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও জানান, মোট ভর্তি হওয়া ৮৯৪ জন রোগীর মধ্যে একটি বড় অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, যা চিকিৎসার সফলতার দিক। তবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে আক্রান্তদের আইসোলেশন নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। গরমের এই সময়ে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগের বিস্তার দ্রুত ঘটে। বিশেষ করে শিশু ও পুষ্টিহীনতায় ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বিশেষ করে সর্দি, কাশি এবং শরীরে র্যাশ বা লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় রামেক হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ার্ডগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সংক্রমণের হার যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ