আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দু’দেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তার নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর স্থগিত করেছেন। ট্রাম্পের দাবিকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে মেলোনি একে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সম্প্রতি ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলন শেষে ইতালীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘লা সেভেন’ (La7)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, সম্মেলনের ফাঁকে মেলোনি তার সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য ‘অনুরোধ’ বা আকুতি করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “সে আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য এতটাই মরিয়া ছিল যে আমি বাধ্য হয়ে রাজি হই। মূলত তার প্রতি অনুকম্পা থেকেই আমি ছবি তুলতে সম্মত হয়েছিলাম।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রচার হওয়ার পরপরই ইতালির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট। একজন মিত্র দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আচরণ অত্যন্ত বিস্ময়কর।” তিনি আরও যোগ করেন, পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুদের প্রতি ট্রাম্প নমনীয় নীতি দেখালেও নিজের মিত্রদের সঙ্গে বৈরি আচরণ করছেন, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। একই সঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, “আমি বা ইতালি রাষ্ট্র হিসেবে কখনো কারও কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করে না।”
এই মন্তব্যের সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়ে ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ২১-২২ জুনের ওয়াশিংটন ও মিয়ামি সফর বাতিল করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তাজানি লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন অশোভন ও আপত্তিকর বক্তব্য সমগ্র ইতালিকে অপমান করেছে। এ কারণে আমি আমার আসন্ন মার্কিন সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
নির্ধারিত এই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের পরিবর্তে নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাজানির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসা, বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন ফোরাম’-এ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কৌশলগত বিষয়ে আলোচনার সূচি ছিল। তাজানির সফর বাতিলের ফলে এই দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও মেলোনির মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতে ইরানের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সংঘাতের বিরোধিতা করায় এবং পোপ চতুর্দশ লিওর প্রতি ট্রাম্পের সমালোচনার নিন্দা জানানোয় মেলোনির ওপর ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প। ট্রাম্প সে সময় মেলোনিকে ‘সাহসীনতাহীন’ বলে আখ্যা দেন। যদিও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর মেলোনিকে ইউরোপে তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ ডানপন্থী মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের মধ্যে মেলোনিই একমাত্র নেতা যিনি ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানের ওপর মার্কিন নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুল্কের মতো মৌলিক বৈশ্বিক ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও রোমের দীর্ঘদিনের নীতিগত পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান এই নতুন ছবি-বিতর্ক দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক মার্কিন-ইউরোপীয় সম্পর্কে আরও গভীর ফাটল সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


