অপরাধ ডেস্ক
ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানা এলাকায় নূরজাহান (৬০) নামের এক বৃদ্ধাকে নৃশংসভাবে মাথা থেঁতলে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মাত্র ৫০০ টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মূল ঘাতক মো. রনি মিয়াকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি ইতিমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ২৮ জানুয়ারি মীরকান্দাপাড়া গ্রামে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত নূরজাহান ওই বাড়িতে একাকী বসবাস করতেন। গ্রেপ্তারকৃত রনি মিয়া একই এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রনি মাঝেমধ্যে তাঁর প্রেমিকাকে নিয়ে নূরজাহানের বাড়িতে অবস্থানের সুযোগ নিতেন এবং এর বিনিময়ে বৃদ্ধাকে ৫০০ টাকা করে ভাড়া প্রদান করতেন। তবে সর্বশেষ অবস্থানের ভাড়া পরিশোধ না করেই তিনি চলে যান, যা নিয়ে উভয়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
রোববার দুপুরে জেলা পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার রাতে রনি মিয়া পুনরায় তাঁর প্রেমিকাকে নিয়ে ওই বাড়িতে অবস্থান করার প্রস্তাব দেন। এ সময় নূরজাহান আগের পাওনা টাকা পরিশোধের দাবি জানান। রনি টাকা দিতে অস্বীকার করলে নূরজাহান হুমকি দেন যে, পাওনা টাকা না দিলে তিনি বাড়িতে অনৈতিক কাজের জন্য লোক নিয়ে আসার বিষয়টি এলাকায় প্রকাশ করে দেবেন। এই হুমকিতে ক্ষিপ্ত হয়ে রনি মিয়া হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে রনি মিয়া ঘরে থাকা শিল দিয়ে নূরজাহানের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর ঘাতক রনি লাশটি রান্নাঘরের পাশে খড়ের গাদার নিচে লুকিয়ে ফেলেন এবং নিহতের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি নিয়ে পালিয়ে যান। ঘটনার দুই দিন পর ৩০ জানুয়ারি রাতে নিখোঁজ নূরজাহানের স্বজনেরা বাড়ির পাশের খড়ের নিচ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের মেয়ে নুরুন নাহার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা অমিতাভ দাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে ঘাতকের অবস্থান শনাক্ত করে। শনিবার ভোরে শম্ভুগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে রনি মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর হেফাজত থেকে নিহতের সেই লুণ্ঠিত মুঠোফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সামান্য ৫০০ টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে এমন একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। হত্যার পর ঘাতক অত্যন্ত সুকৌশলে লাশ গোপন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার চেষ্টা করছিল। তবে নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।”
গ্রেপ্তারের পর শনিবার বিকেলেই রনি মিয়াকে ময়মনসিংহের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তিনি বিজ্ঞ বিচারকের কাছে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাঁকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এবং চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে বলে পিবিআই সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।


