তামিলনাড়ুতে বিজয়ের দলের সঙ্গে কংগ্রেসের নতুন সমীকরণ: ডিএমকে জোটের অবসান

তামিলনাড়ুতে বিজয়ের দলের সঙ্গে কংগ্রেসের নতুন সমীকরণ: ডিএমকে জোটের অবসান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের দক্ষিণি রাজ্য তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণ ভেঙে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া থালাপথি বিজয়ের রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্ত্রি কাজাগমকে (টিভিকে) সরকার গঠনে সমর্থনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে টিভিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তামিলনাড়ু কংগ্রেসের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স কমিটির এক বিশেষ বৈঠকে এই সমর্থনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশিকান্ত সেন্টিল গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর রাজ্য কংগ্রেস টিভিকে-কে সরকার গঠনে সহযোগিতার অনুমোদন দিয়েছে। মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে দলটি।

দলীয় সূত্রমতে, কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী শুরু থেকেই বিজয়ের দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক ছিলেন। তবে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই সিদ্ধান্তের ভার রাজ্য ইউনিটের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমন্বিত সিদ্ধান্তে টিভিকে-এর পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এই সমর্থনের বিনিময়ে কংগ্রেস বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য মন্ত্রিসভায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পদ প্রত্যাশা করছে। তবে সমর্থনের ক্ষেত্রে কংগ্রেস একটি কঠোর শর্ত আরোপ করেছে; তা হলো—বিজয় বা তার দল টিভিকে কোনোভাবেই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট কিংবা তাদের মিত্র এআইএডিএমকের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আঁতাত করতে পারবে না।

এই নতুন রাজনৈতিক জোটের ফলে তামিলনাড়ুর দীর্ঘ কয়েক দশকের দ্বিমেরু রাজনীতির অবসান ঘটল। গত কয়েক দশক ধরে রাজ্যটি মূলত ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের পাল্টাপাল্টি শাসনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কংগ্রেস ও ডিএমকের দীর্ঘদিনের পুরনো জোটের যবনিকাপাত ঘটল। ইতিপূর্বে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে এই জোট অভাবনীয় সাফল্য পেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

কংগ্রেসের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্ষমতাসীন ডিএমকে। দলটির মুখপাত্র এ সারাভানান এই পদক্ষেপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্রকে ত্যাগ করে নতুন দলের সঙ্গে হাত মেলানো রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত। এই ঘটনা জোট রাজনীতির ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তামিলনাড়ুর ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। বিজয় নেতৃত্বাধীন টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছালেও এককভাবে সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সমর্থন বিজয়ের জন্য সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করে দিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ সমাজ এবং সিনেমার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে বিজয় যে রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছেন, কংগ্রেসের সমর্থন তাকে প্রশাসনিক ভিত্তি প্রদান করবে।

এদিকে জনগণের এই বিপুল জয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন টিভিকে প্রধান বিজয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই বিজয় কোনো একক ব্যক্তির বা দলের নয়, বরং এটি তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও গণতন্ত্রের জয়। তিনি একটি স্বচ্ছ ও জনবান্ধব সরকার উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর এই ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল একটি রাজ্যের বিষয় নয়, বরং এটি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কংগ্রেসের এই নতুন মিত্র অনুসন্ধান আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সমীকরণকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। বিজয়ের হাত ধরে তামিলনাড়ুতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ