রাজনৈতিক ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, টালবাহানা করে ‘জুলাই সনদ’ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি অবিলম্বে গণভোটের নির্দেশনা অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন। শনিবার (৯ মে) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে একটি অভিজাত হোটেলে ‘সংস্কারে অচলাবস্থা সমাধানে করণীয় কী’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি এই সভার আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত বিভিন্ন কৌশলে সময়ক্ষেপণ করছে। বিশেষ করে জুলাই সনদের চেতনার আলোকে যে সাংবিধানিক পরিবর্তনের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো ধরনের ছলচাতুরী বা টালবাহানা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ মেনে নেবে না। জনগণের অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতেই দেশের সংবিধান পুনর্গঠন বা সংস্কার করতে হবে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক সংস্কার একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নাহিদ ইসলামের দাবি অনুযায়ী, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্কার কাউন্সিল গঠন করা হলে তা রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হলে সব পক্ষের ঐকমত্য প্রয়োজন। তবে সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এ সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জনসম্মুখে গণভোটের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার আসার পর তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। গণভোটের বিরোধিতা করার অর্থ হলো জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা। এই অবস্থান পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনআকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
আলোচনা সভায় নাহিদ ইসলাম এনসিপির ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংস্কার কাউন্সিল গঠনের দাবিতে তাদের দল সংসদের ভেতর ও বাইরে সমানভাবে সোচ্চার থাকবে। গণতান্ত্রিক পন্থায় আলোচনার পথ সব সময় উন্মুক্ত রাখা হবে, তবে সরকার যদি দাবি আদায়ে ইতিবাচক সাড়া না দেয়, তবে কঠোর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে এনসিপি। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত গঠন করে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা হবে বলেও তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই কঠোর অবস্থান আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ইস্যুটি সামনে আসায় সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অনুষ্ঠানে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উচ্চপর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন ও সারোয়ার তুষার। এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা আলম মিতু এবং নুসরাত তাবাসসুম রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারে নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ও তারিকুল ইসলামসহ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃবৃন্দ। বক্তারা প্রত্যেকেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


