আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সাম্প্রতিক আকাশযুদ্ধে পাকিস্তান বিমানবাহিনীকে (পিএএফ) সরাসরি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে চীন। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল সিসিটিভিতে সম্প্রচারিত একটি সাক্ষাৎকারে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দাবি করা হয়, সংঘাত চলাকালীন যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চীনের প্রকৌশলীরা মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘চেংদু এয়ারক্রাফট ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ঝ্যাং হেং এই সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনার মধ্যে তাদের বিশেষ কারিগরি দল পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলোর নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন নিশ্চিত করতে কাজ করেছে। মূলত পাকিস্তানের বহরে থাকা অত্যাধুনিক জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা এবং এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাই ছিল এই টিমের প্রধান লক্ষ্য।
সিসিটিভির ওই প্রতিবেদনে এক বিশেষ তথ্যে দাবি করা হয়, সংঘাত চলাকালে চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান আকাশপথে যুদ্ধের সময় ভারতের একটি ফরাসি নির্মিত ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, জে-১০সিই যুদ্ধবিমানটি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অব চায়নার (এভিক) একটি অন্যতম আধুনিক সংস্করণ, যা পাকিস্তান কয়েক বছর আগে তাদের বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে। রাফালের মতো শক্তিশালী চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে জে-১০সিই-এর এই তথাকথিত সাফল্য সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রকৌশলী ঝ্যাং হেং সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “যুদ্ধ চলাকালীন আমরা নিয়মিতভাবে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত শুনতাম। তীব্র গরম ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও আমাদের বিশেষ দল নিরলসভাবে কাজ করে গেছে, যাতে প্রতিটি যুদ্ধ সরঞ্জাম তার পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই মিশনটি কেবল জে-১০সিই বিমানের যান্ত্রিক উৎকর্ষ প্রমাণ করে না, বরং এটি বেইজিং ও ইসলামাবাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও সামরিক অংশীদারত্বের গভীরতাকেও প্রতিফলিত করে।
ভারত ও পাকিস্তানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল গত বছরের ২২ এপ্রিল। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর এক ভয়াবহ হামলায় ২৬ জন নিহত হন। নয়াদিল্লি এই ঘটনার জন্য সরাসরি পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীকে দায়ী করে। যদিও ইসলামাবাদ শুরু থেকেই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। এর ধারাবাহিকতায় ৭ মে ভারত পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাকিস্তানও এর তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দেয়। টানা চার দিনব্যাপী চলা এই আকাশ সংঘাত শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপে উভয় দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
সংঘাত চলাকালেই ভারতের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান অভিযোগ করেছিলেন যে, চীন কেবল প্রযুক্তিগত সহায়তা নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য দিয়েও পাকিস্তানকে সরাসরি সাহায্য করছে। ভারতের দাবি ছিল, চীনের স্যাটেলাইট ও রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলোর রিয়েল-টাইম তথ্য পাকিস্তানের কাছে পৌঁছানো হচ্ছিল। সেই সময় বেইজিং এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও বর্তমান এই স্বীকৃতি ভারতের সেই অভিযোগকে নতুন করে জোরালো করল।
এদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছিল যে, আকাশযুদ্ধে পাকিস্তানের জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের হাতে অন্তত একটি ভারতীয় রাফাল বিধ্বস্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও ভারত এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি, তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং আকাশযুদ্ধের শক্তিসাম্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীনের এই স্বীকারোক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চ্যালেঞ্জ এবং চীন-পাকিস্তান অক্ষের সামরিক সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করল।


