আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর দুটি পৃথক হামলায় এক শিশু ও তিন নারীসহ অন্তত সাতজন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন। আকস্মিক এই হামলায় আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ৫০ জন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, হামাসের বর্তমান সামরিক প্রধান ইজ্জ আল-দিন আল-হাদ্দাদকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে হামলায় তার হতাহত হওয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
স্থানীয় চিকিৎসাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার গাজা শহরের রিমাল এলাকায় কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই একটি বহুতল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি চালানো হয়। এর কিছুক্ষণ পর নিকটবর্তী একটি সড়কে চলমান একটি যাত্রীবাহী গাড়িকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লক্ষ্যবস্তু হওয়া বহুতল ভবনটিতে শত শত বেসামরিক মানুষ বসবাস করছিলেন। আকস্মিক ও তীব্র বিস্ফোরণে ভবনটির একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে সেখানে আগুন ধরে যায়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে হতাহতদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত সাতটি মরদেহ এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ চাপা পড়ে আছেন কিনা তা নিশ্চিতে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক যৌথ বিবৃতিতে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, এই বিশেষ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল হামাস কমান্ডার ইজ্জ আল-দিন আল-হাদ্দাদ। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন হামাস কমান্ডার মোহাম্মদ সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর ইজ্জ আল-দিন আল-হাদ্দাদ সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের নজিরবিহীন হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই হাদ্দাদ। ইসরায়েলি নাগরিক ও সৈন্যদের হত্যা এবং অপহরণের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাকে দীর্ঘ দিন ধরে খুঁজছিল ইসরায়েল। তবে এই সফল বা ব্যর্থ অভিযান এবং হাদ্দাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে হামাসের রাজনৈতিক বা সামরিক উইং থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এই হামলা নতুন করে উত্তেজনা ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। গত অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা ও সমর্থনে একটি সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর গাজায় বড় আকারের সংঘাত ও বোমাবর্ষণ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। তবে চুক্তি কার্যকর হলেও অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসেনি। গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের পুনর্নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল বিষয়গুলো নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনা বর্তমানে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন ‘গাজা-পরবর্তী’ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই এই হাই-প্রোফাইল বিমান হামলাটি চালানো হলো। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই হামলা চলমান শান্তি আলোচনাকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসের ওই আন্তর্জাতিক চুক্তির পর থেকে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ধারাবাহিক ইসরায়েলি অভিযানে প্রায় ৮৫০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে গাজা উপত্যকার অর্ধেকেরও বেশি ভূখণ্ড ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের ফলে ওই অঞ্চলের ২০ লক্ষাধিক বাসিন্দা চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার তীব্র অভাবের মধ্যে বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে অস্থায়ী তাঁবু এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়িতে অত্যন্ত মানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দিনাতিপাত করছেন।


