আইন ও আদালত ডেস্ক
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো বিতর্ক ও রহস্য রয়ে গেছে। তবে আধুনিক আইনি ও অপরাধ তদন্ত বিজ্ঞান বলছে, বর্তমান যুগে উন্নত ফরেনসিক সাইকোলজিক্যাল টুলস এবং বৈজ্ঞানিক তদন্ত পদ্ধতি ব্যবহার করলে এ ধরনের জটিল মামলার সত্য উদ্ঘাটন করা অসম্ভব নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে অপরাধ তদন্তে যেসব আধুনিক প্রযুক্তি নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো বাংলাদেশের বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থায় যুক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মামলার জট খোলা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অপরাধ বিজ্ঞানের আধুনিকায়ন এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও নিখুঁত করতে মূলত তিনটি ফরেনসিক সাইকোলজিক্যাল টুল বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ‘লেয়ার্ড ভয়েস অ্যানালিসিস’ বা এলভিএ (Layered Voice Analysis)। এই পদ্ধতিতে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত বা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের বক্তব্য অডিও এবং ভিডিও আকারে রেকর্ড করা হয়। পরবর্তীতে বিশেষায়িত সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেই কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করে বোঝা সম্ভব হয় যে, ব্যক্তি ঠিক কোন আবেগীয় অবস্থান থেকে কথা বলছেন। কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন বা বিষয়ের মুখোমুখি হলে তার মধ্যে মানসিক চাপ (stress) বা অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে কি না, তা এলভিএ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা যায়। এই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত কর্মকর্তারা আরও নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন, যা প্রকৃত সত্য বের করে আনতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিটি হলো পলিগ্রাফ এক্সামিনেশন (Polygraph Examination), যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘লাই ডিটেকশন টেস্ট’ বা মিথ্যা সনাক্তকরণ পরীক্ষা নামে পরিচিত। এলভিএ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সন্দেহভাজনদের ওপর এই পলিগ্রাফ পরীক্ষা চালানো যায়। একজন ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড বা অপরাধের ঘটনা সম্পর্কে কোনো তথ্য গোপন করছেন কি না কিংবা ঘটনার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী সূত্র দেয় এই পরীক্ষা। এটি তদন্তকারী সংস্থাকে ভুল পথে চালিত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
তৃতীয়ত, কোনো অভিযুক্ত বা সাক্ষী যদি জিজ্ঞাসাবাদে একেবারেই সহযোগিতা করতে না চান, সে ক্ষেত্রে ‘ব্রেইন ম্যাপিং’ বা বিইওএস/পি৩০০ বেসড অ্যাসেসমেন্ট (Brain Electrical Activation Profile) অত্যন্ত কার্যকর একটি বিকল্প। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বা ইইজি (EEG) বিশ্লেষণ করা হয়। অপরাধের দৃশ্য, ব্যবহৃত অস্ত্র বা মামলার অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য যখন ওই ব্যক্তির সামনে উপস্থাপন করা হয়, তখন তার মস্তিষ্কের তরঙ্গের স্বয়ংক্রিয় পরিবর্তন পরিমাপ করা হয়। এর মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্ণয় করা সম্ভব হয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই অপরাধের ঘটনার সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতামূলক সংযোগ বা স্মৃতি রাখেন কি না। অর্থাৎ, মুখে কিছু না বললেও তার মস্তিষ্ক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে পারে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন আদালত ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো (যেমন সিবিআই) দীর্ঘদিন ধরে জটিল ও সংবেদনশীল মামলার রহস্য উন্মোচনে এসব বৈজ্ঞানিক টুল সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, যদিও এই ফরেনসিক সাইকোলজিক্যাল পরীক্ষাগুলোর ফলাফলকে সব ক্ষেত্রে আদালতের কাঠগড়ায় একক ও চূড়ান্ত প্রমাণ (Conclusive evidence) হিসেবে গণ্য করা হয় না, তবুও তদন্তকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে এবং নতুন ও অকাট্য তথ্য উদ্ঘাটনে সহায়ক প্রমাণ (Supportive evidence) হিসেবে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের বিদ্যমান বিচার ও অপরাধ তদন্ত ব্যবস্থায় ডিজিটাল ফরেনসিকের কিছু ব্যবহার থাকলেও, এই ধরনের আধুনিক ফরেনসিক সাইকোলজিক্যাল টুলসের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। সালমান শাহ হত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর এবং দীর্ঘমেয়াদী তদন্তের ক্ষেত্রে এই আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা ও আধুনিকায়নকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অপরাধ গবেষকেরা।


