নিজস্ব প্রতিবেদক
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘হারমনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২’। শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফিনলে চা বাগানের ফুলছড়া মাঠে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি ও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর বহুত্ববাদী বৈচিত্র্যের মাঝে। আমাদের দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর ভিন্নতা কোনো বিভেদ তৈরি করে না, বরং তা জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় ও আমাদের সংস্কৃতিকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করে তোলে।
পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা তাঁর বক্তব্যে শ্রীমঙ্গলের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, শ্রীমঙ্গল কেবল দেশের চায়ের রাজধানী হিসেবেই পরিচিত নয়, এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যতম বহু-সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এই উপজেলা ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে প্রায় ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। এই জনগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব ভাষা, অনন্য সংস্কৃতি, প্রাচীন ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় শিল্পকলা এবং জীবনধারা আমাদের সামগ্রিক জাতীয় সংস্কৃতিকে অত্যন্ত বর্ণিল ও ঐতিহ্যবাহী করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হারমনি ফেস্টিভ্যাল কেবল একটি গতানুগতিক সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি মূলত বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য মিলনমেলা। এবারের উৎসবে একযোগে ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অসাধারণ ও ঐতিহাসিক উপস্থাপনাই প্রমাণ করে।
বর্তমান সরকারের পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম (জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক পর্যটন), এথনিক ট্যুরিজম (নৃ-গোষ্ঠী পর্যটন) এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন বিকাশের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে কেবল উৎসব বা প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সেটিকে একটি শক্তিশালী পর্যটন সম্পদে রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এই ধরনের উদ্যোগের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও টেকসই করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই উৎসব আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
চা-বাগানের মনোরম ও সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশে আয়োজিত এই উৎসবে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, হরেক রকমের দেশীয় পণ্য, হস্তশিল্প এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। উৎসবের বিভিন্ন স্টলে খাসিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পান প্রস্তুতি, মণিপুরী সম্প্রদায়ের সুনিপুণ তাঁতশিল্প, ত্রিপুরাদের বিশেষ কোমর তাঁত এবং শবর ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা অত্যন্ত নিপুণভাবে সাধারণ দর্শনার্থী ও পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফিনলে চা বাগানের ফুলছড়া মাঠে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শুরু হওয়া এই বিশেষ উৎসব আগামী ২১ জুন পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতারের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাসের রহমান, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মোল্লা। বক্তারা বলেন, পর্যটন শিল্পের টেকসই বিকাশের পাশাপাশি এ দেশের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের উৎসব দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুর রউফ, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান (বিপিএম, পিপিএম, এনডিসি), মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল এবং মৌলভীবাজারের police সুপার মো. মনিরুল ইসলামসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সামাজিক ও political নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। বক্তারা প্রত্যেকেই পরিবেশবান্ধব উপায়ে শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করে পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।


