আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গত ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর ইরানের ভেতরে এবং দেশের বাইরে বসবাসরত ইরানিদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় গুঞ্জন ছড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় ইরানে সামরিক হামলা চালাতে পারে। এ ধরনের আশঙ্কা ইরানের শহরগুলোতে এক অস্থির মানসিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যদিও দৈনন্দিন জীবন দৃশ্যত স্বাভাবিক রয়েছে।
তেহরানে বসবাসকারী একাধিক নাগরিক জানিয়েছেন, ওই রাতে অনেকেই নির্ঘুম সময় কাটান। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় মানুষ বিস্ফোরণের শব্দের জন্য সজাগ ছিলেন। রাজধানীর বাসিন্দা এক মধ্যবয়সী প্রকৌশলী বলেন, অনিশ্চয়তার কারণে তিনি গভীর রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারেননি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আরও অনেকে।
পরদিন সকালে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সম্ভাব্য হামলার সময় ও ধরন। অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা চলতে দেখা যায়। কয়েকজন প্রবীণ নাগরিক মনে করেন, বিদেশি হামলা ইরানের সংকট সমাধান করবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও মরিয়া মনোভাব তৈরি হয়েছে, যা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা দিচ্ছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে কঠোর বক্তব্য ও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রয় চুক্তি ইরানিদের মধ্যে ভবিষ্যৎ সংঘাতের আশঙ্কা আরও জোরালো করেছে।
এর আগে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের একটি বাজার এলাকা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিহতের সংখ্যা সাড়ে ৬ হাজারের বেশি বলে দাবি করেছে। নিহতদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক কোনো নিরপেক্ষ সংস্থা এখনো এসব সংখ্যার চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। ওই ঘটনার পর থেকে দেশটির সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
বর্তমান শাসনব্যবস্থার সমালোচক অনেক নাগরিকের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে যুদ্ধভীতিকে আরও তীব্র করেছে। অনেকে সরাসরি যুদ্ধের কথা বলতে এড়িয়ে চললেও, সবাই সম্ভাব্য প্রথম বিস্ফোরণের আশঙ্কা করছেন। এ কারণে কিছু বাসিন্দা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছেন, যেমন জানালার কাচ সিল করা বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্তুত রাখা।
বিক্ষোভ দমনের সময় ইরান সরকার সাময়িকভাবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। তিন সপ্তাহ পর ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বোমাবর্ষণ থেকে আত্মরক্ষার নানা পরামর্শ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে কয়েক দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখা, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী প্রস্তুত রাখা, জরুরি নথিপত্র একত্রে রাখা এবং দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা। এসব পরামর্শের উৎস স্পষ্ট নয়, তবে এর প্রভাব জনমনে স্পষ্টভাবে পড়ছে।
কয়েকজন নাগরিক জানিয়েছেন, তাঁরা সতর্কতামূলকভাবে অতিরিক্ত খাবার, পানি ও ওষুধ কিনে রেখেছেন। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের মধ্যে ওষুধ মজুতের প্রবণতা বেড়েছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধসহ অতীতের একাধিক সংঘাত প্রত্যক্ষ করা প্রবীণরা নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কায় গভীর হতাশা প্রকাশ করছেন। তাঁদের মতে, নতুন কোনো যুদ্ধ দেশটির অবশিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও বিপর্যস্ত করতে পারে।
এই উদ্বেগ কেবল ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রায় ৪০ লাখ ইরানি প্রবাসীর মধ্যেও একই ধরনের উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আবারও ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ফলে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে তাঁরা ইরানে থাকা বয়স্ক স্বজনদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন।
বর্তমানে ইরানের শহরগুলোতে বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। দোকানপাট খোলা, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। তবে এই দৃশ্যমান শান্ত পরিবেশের আড়ালে একটি গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা কাজ করছে। অনেকের মতে, আগের সংঘাতের অভিজ্ঞতা মানুষকে মানসিকভাবে কিছুটা প্রস্তুত করেছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা এখনো কাটেনি।


