অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আরও ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে মানসম্পন্ন ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে অবনমন করে সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পাঠিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আজ রোববার (৩ মে) থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ব্যবস্থায় এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতা এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে এসব ব্যাংককে ‘জাঙ্ক স্টক’ বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত ব্যাংকগুলো হলো—এবি ব্যাংক পিএলসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, এনআরবি ব্যাংক পিএলসি, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি, ওয়ান ব্যাংক পিএলসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসি।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি বা ব্যাংক যদি টানা দুই বছর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ (নগদ বা বোনাস) দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। আলোচ্য ১০টি ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো মুনাফা দিতে সক্ষম হয়নি। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বাজারের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংক বা কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যাওয়ার অর্থ হলো ওই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়া। এর ফলে বাজারে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের চাহিদা হ্রাস পায় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির সম্মুখীন হন। নিয়ম অনুযায়ী, ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের মার্জিন ঋণ বা লোন সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ, নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়া এই শেয়ার কেনা সম্ভব হবে না। এছাড়া লেনদেনের নিষ্পত্তির সময়সীমাও সাধারণ শেয়ারের তুলনায় দীর্ঘতর হতে পারে।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল একই ধরনের আর্থিক অসংগতির কারণে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক পিএলসিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। আজকের নতুন ১০টি ব্যাংকসহ এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোট ১৩টি ব্যাংকের ক্যাটাগরি অবনমন ঘটল। ব্যাংক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের এতগুলো প্রতিষ্ঠানের এই নিম্নমুখী অবস্থান সামগ্রিক পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিরতা এবং পুঁজিবাজারে এর প্রতিফলন সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। ফলে তারা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়বে, যাতে তারা তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সচেষ্ট হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্তের ফলে শেয়ারবাজারে ব্যাংক খাতের শেয়ারের দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সাথে শেয়ার লেনদেনের পরামর্শ দিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিএসইসি জানিয়েছে, পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় আইন অমান্যকারী ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এ ধরনের তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।


