আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় রাজ্যে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে চললেও মুখ্যমন্ত্রী এখনো রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেননি। ফলে শুক্রবার থেকে রাজ্যে স্বল্পমেয়াদী রাষ্ট্রপতি শাসন জারির প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরাজয় নিশ্চিত হলে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরবর্তী সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত রাজ্যপাল বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকেই ‘কেয়ারটেকার’ বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করেন। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সৌজন্য অগ্রাহ্য করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজভবনে গিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করবেন না।
এদিকে নবনির্বাচিত প্রধান বিরোধী দল বিজেপি আগামী ৯ মে শনিবার রবীন্দ্র জয়ন্তীর পুণ্যতিথিতে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন ধার্য করেছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচিত বিধানসভার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিদায়ী সরকার আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় থাকতে পারে না। আজ ৭ মে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে বর্তমান সরকারের আইনি বৈধতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে এই মধ্যবর্তী সময়ে রাজ্য শাসনের ভার কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবীণ আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি বিরল। সাধারণত তামিলনাড়ুসহ অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও পরাজয়ের পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন এবং নতুন সরকার না আসা পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনড় অবস্থানের কারণে ৮ মে শুক্রবার পুরো ২৪ ঘণ্টা রাজ্যে কোনো নির্বাচিত সরকার থাকবে না। এই শূন্যতা পূরণে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সরাসরি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা ছাড়া রাজ্যপালের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা ইতিমধ্যে ২৯৩টি কেন্দ্রের নির্বাচিত বিধায়কদের গেজেট বিজ্ঞপ্তি রাজ্যপালের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এই তালিকার ভিত্তিতেই রাজ্যপাল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। প্রখ্যাত আইনজীবী হরিশ সালভেসহ অন্যান্য সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন যে, রাজ্যপাল নিজেই মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করতে পারেন। যদি তিনি পদত্যাগ করেন, তবে তাকেই তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে। অন্যথায়, ৯ মে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আগ পর্যন্ত সময়টুকুর জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন কার্যকর করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ ও সৌজন্যমূলক হস্তান্তরের যে ঐতিহ্য ভারতে বিদ্যমান, বর্তমান স্থবিরতা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শুক্রবারের এই সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি শাসন হবে রাজ্যের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, যা কেবল রাজনৈতিক জেদ ও সাংবিধানিক জটিলতার কারণে উদ্ভূত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তৃণমূল নেত্রী তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে আগামীকাল থেকেই কেন্দ্র মনোনীত শাসনের অধীনে চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ।
সূত্র : এই সময়


