জাতীয় ডেস্ক
নির্বাচনী কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও দুর্ঘটনার বিপরীতে আর্থিক সহায়তার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন এই নীতিমালা অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিহত হলে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে। একই সাথে দায়িত্ব পালনকালে গুরুতর ও সাধারণ আহতদের আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও এই নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের উপ-সচিব রাশেদুল ইসলামের সই করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নীতিমালা কার্যকর করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কমিশনের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর আগে দায়িত্ব পালনকালে কোনো দুর্ঘটনা বা হতাহতের ঘটনা ঘটলে আর্থিক অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। নতুন এই আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর ফলে অনুদানের অর্থ প্রাপ্তি এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তা বণ্টনের দীর্ঘদিনের আইনি সংকট দূর হবে। একই সাথে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে।
কমিশনের জারিকৃত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী ডিউটি বা ভোটার তালিকা প্রস্তুতের কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যদি কোনো দুর্ঘটনা কিংবা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবার এককালীন ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান পাবেন। এছাড়া, একই ধরনের সহিংসতা বা দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতা বা অঙ্গ হারালে (স্থায়ী অক্ষমতা) তাকে ৪ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। অন্যদিকে, গুরুতর আহত কিন্তু সাময়িকভাবে কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিদের জন্য ২ লাখ টাকা এবং অপেক্ষাকৃত কম বা সাধারণ আহতদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার বিধান রাখা হয়েছে।
সহিংসতা বা বাহ্যিক দুর্ঘটনা ছাড়াও দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে প্রাকৃতিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া বা স্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়টিকেও এই নীতিমালার আওতায় আনা হয়েছে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মী আকস্মিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করলে তার পরিবারকে ৬ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। দায়িত্ব পালন অবস্থায় প্রাকৃতিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে স্থায়ী অক্ষমতার শিকার হলে ৩ লাখ টাকা এবং সাময়িকভাবে অসুস্থ হলে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ হয়ে কোনো কর্মী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণ করলে ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনুদান লাভ করবেন।
তবে এই আর্থিক সুবিধা বা অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলে কমিশনের নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে অথবা তার অবর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণাদিসহ আবেদন করতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে এই আবেদনটি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গঠিত একটি নির্দিষ্ট স্থায়ী কমিটির কাছে উত্থাপন করা হবে। কমিটি আবেদনের সত্যতা, চিকিৎসার বিবরণী এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র মূল্যায়ন করে কমিশনের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। পরবর্তীতে কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে বরাদ্দকৃত অর্থ সরাসরি উপকারভোগী বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই নীতিমালাটি প্রণয়নের ফলে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাজের গতি ও মনোবল অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের সময় যে অনিশ্চয়তা কাজ করত, এই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার ফলে তা অনেকটাই লাঘব হবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অবিলম্বে এই নীতিমালা মাঠপর্যায়ের সকল নির্বাচনী জোনে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


