৯ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণে চুক্তি সই, ঘুচবে ফেরি দুর্ভোগ

৯ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণে চুক্তি সই, ঘুচবে ফেরি দুর্ভোগ

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ৯ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে এই বাস্তবায়ন চুক্তি (ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি শুরু হলো।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্মসচিব (বৈদেশিক সহায়তা অধিশাখা) ড. মো. মোকছেদ আলী, এনডিসি। অন্যদিকে চীন সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের কাউন্সেলর সং ইয়াং। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৯ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুটি পটুয়াখালী জেলার লেবুখালী–বাউফল–গলাচিপা–আমড়াগাছিয়া জেলা মহাসড়কের (জেড-৮৮০৬) ১৪তম কিলোমিটারে লোহালিয়া নদীর ওপর নির্মাণ করা হবে। সেতুটির অবস্থান হবে বর্তমান বগা ফেরিঘাটের ভাটি অঞ্চলে। প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ১ দশমিক ৩৪৮ কিলোমিটার এবং সংযোগ সড়কের (অ্যাপ্রোচ রোড) দৈর্ঘ্য হবে ১ দশমিক ২৭২ কিলোমিটার।

দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তির শর্তানুযায়ী, মূল সেতু এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল অর্থায়ন অনুদান হিসেবে প্রদান করবে চীন সরকার। অন্যদিকে প্রকল্প এলাকার ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি শিফটিং বা পরিষেবা সংযোগ স্থানান্তর এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অভ্যন্তরীণ ব্যয় বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তী ধাপ হিসেবে চীন সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুতই সেতুর বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণের কাজ শুরু করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অংশের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের কার্যক্রমও বর্তমানে চলমান রয়েছে। প্রশাসনিক ও কারিগরি এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হওয়ার পরপরই মাঠপর্যায়ে মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।

পটুয়াখালী জেলার বাউফল, গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ নিরসনে এই সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জেলা সদরসহ সারা দেশের সাথে যোগাযোগের জন্য সম্পূর্ণভাবে ফেরির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার দিনে ঝুঁকিপূর্ণ। সেতুটি নির্মিত হলে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ফেরিনির্ভরতার অবসান ঘটবে এবং সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই সেতুটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক চিত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। পটুয়াখালী ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার প্রধান অর্থনৈতিক উৎস হচ্ছে কৃষি ও মৎস্যসম্পদ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এখানকার উৎপাদিত পচনশীল কৃষিপণ্য ও মৎস্যসম্পদ সময়মতো দেশের বড় বাজারগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, ফলে প্রান্তিক চাষি ও ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। সেতুটি চালু হলে অত্যন্ত দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। এছাড়া পায়রা সমুদ্র বন্দর এবং কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রের সাথে এই অঞ্চলের সংযোগ আরও সুদৃঢ় হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এই অবকাঠামোটি জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ