বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের জেরে উত্তর আয়ারল্যান্ডে দ্বিতীয় রাতেও দাঙ্গা, আহত ১২ পুলিশ

বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের জেরে উত্তর আয়ারল্যান্ডে দ্বিতীয় রাতেও দাঙ্গা, আহত ১২ পুলিশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের বেলফাস্টে এক রক্তাক্ত ছুরিকাঘাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তর আয়ারল্যান্ডে টানা দ্বিতীয় রাতেও ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়েছে। দুই দিনব্যাপী চলা এই সহিংসতায় অন্তত ১২ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক সেক্রেটারি হিলারি বেন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রথম রাতের তুলনায় দ্বিতীয় রাতে সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কম ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে এবং দাঙ্গাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে।

সহিংসতার সূত্রপাত হয় গত সোমবার কো অ্যান্ট্রিম এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এর পর থেকেই ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছিল, যা পরবর্তীতে দাঙ্গায় রূপ নেয়। দ্বিতীয় রাতে বেলফাস্টের উত্তর-পশ্চিমে নিউ টাউনঅ্যাবির স্যান্ডিনোজ রাউন্ডঅ্যাবাউট এলাকায় পুলিশ ও দাঙ্গাকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাধে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, কালো পোশাক পরিহিত এবং মুখ ঢাকা কয়েক ডজন যুবক অ্যান্ট্রিম রোডে জড়ো হয়ে ইট ও পাথর সংগ্রহ করছে। তারা হাতুড়ি দিয়ে বড় পাথর ভেঙে পুলিশের দিকে নিক্ষেপের জন্য ছোট টুকরো প্রস্তুত করছিল।

স্যান্ডিনোজ এলাকায় প্রায় ২০০ মানুষের একটি উগ্র জনতা জড়ো হয়ে পুলিশের দিকে লক্ষ্য করে পেট্রল বোমা ও ইট ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে দাঙ্গাকারীরা একটি সরকারি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং একটি পেট্রল স্টেশনের পাশে পরিত্যক্ত একটি ভবনে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়। এ ছাড়া আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বাড়ির সামনে থাকা চাকার ময়লার বিন টেনে এনে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ডেরি শহরের আর্ডমোর রোড এলাকাতেও একই ধরনের অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সেখানে দুটি জলকামান ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।

টানা দ্বিতীয় রাতের এই সহিংসতার কারণে স্থানীয় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উত্তর আয়ারল্যান্ডে কিছু রুটের গণপরিবহন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি ঘোষণা করে।

এদিকে, সোমবারের মূল ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৩০ বছর বয়সী হাদি আলোদিদ নামের এক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। ওই হামলায় গুরুতর আহত হন চল্লিশোর্ধ্ব স্টিফেন ওগিলভি নামের এক ব্যক্তি। হামলায় তিনি একটি চোখ হারিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বেলফাস্টের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এবং তার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। আদালতে হাজির করা অভিযুক্ত আলোদিদের বিরুদ্ধে ওগিলভিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা ও দাঙ্গার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভুক্তভোগী স্টিফেন ওগিলভির পরিবার। পুলিশ মারফত দেওয়া এক বিবৃতিতে ওগিলভির পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হামলাকে কেন্দ্র করে ছড়ানো বিভিন্ন ‘ভুল তথ্য’ ও গুজব বন্ধ করার জোর আহ্বান জানিয়েছে। চলমান এই দাঙ্গার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করে তারা স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই সহিংসতার সাথে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।

বিবৃতিতে পরিবারটি উল্লেখ করে, “এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যে সহিংসতা চলছে, আমরা তা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।” তারা দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অভিবাসীদের ইতিবাচক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমাদের দেশে অনেক অভিবাসী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও আতিথেয়তা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে তাদের এই অবদান অনস্বীকার্য।”

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বেলফাস্টে শুরু হওয়া এই দাঙ্গায় বেশ কয়েকটি বাড়ি, একটি যাত্রীবাহী বাস ও একাধিক ব্যক্তিগত গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কিছু মানুষকে সম্পূর্ণ তাদের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যারা সমাজে এই বিভাজন তৈরি করছে এবং সহিংসতা উসকে দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্তমানে ওইসব এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ