জি-৭ সম্মেলনে ছবি তোলা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান মেলোনির, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মার্কিন সফর বাতিল

জি-৭ সম্মেলনে ছবি তোলা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান মেলোনির, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মার্কিন সফর বাতিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক বাদানুবাদ তৈরি হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, মেলোনি তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ‘অনুরোধ’ করেছিলেন। তবে এই দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন’ বলে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী। এই ঘটনার জেরে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তাঁর পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও রোমের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। ইতালির সম্প্রচারমাধ্যম ‘লা৭’ (La7) টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, জি-৭ সম্মেলনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, ‘জর্জিয়া মেলোনি আমার সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। মূলত তাঁর প্রতি একধরনের সহানুভূতি বা খারাপ লাগা থেকেই আমি ছবিটি তুলতে রাজি হয়েছিলাম, যদিও আমার তাঁর সঙ্গে কথা বলার কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছিল না।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি ট্রাম্পের দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে গভীর বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। মেলোনি লিখেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মনগড়া। সত্যি বলতে, আমি অত্যন্ত বিস্মিত ও হতাশ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কেন তাঁর দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে এমন অবমাননাকর আচরণ করেন, তা আমার বোধগম্য নয়। তবে পশ্চিমা মিত্রদের ছোট করে কথা বলার ঘটনা তাঁর জন্য এটিই প্রথম নয়।’

বিবৃতিতে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের বৈশ্বিক নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও খোলামেলা সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিমা বিশ্বের শত্রু কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে এমন দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে পারেন না। বরং তাদের ক্ষেত্রে প্রায়শই তাঁকে অনেক বেশি নমনীয় আচরণ করতে দেখা যায়। মেলোনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘একটি বিষয় সবার মনে রাখা উচিত যে—আমি কিংবা ইতালি রাষ্ট্র হিসেবে কখনো কারও কাছে কোনো কিছু অনুরোধ বা ভিক্ষা করে না।’ মেলোনির এই অনমনীয় অবস্থান ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ কেবল মৌখিক প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যকে সমগ্র ইতালির জন্য চরম অপমানজনক হিসেবে অভিহিত করে নিজ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তাঁর নির্ধারিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তাজানি স্পষ্ট করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই গুরুতর ও অপমানজনক বক্তব্য কোনো একক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি সমগ্র ইতালি ও ইতালীয় জনগণকে অবমাননা করেছে। এমতাবস্থায় এই সফরটি চালিয়ে যাওয়া দেশের জাতীয় মর্যাদার পরিপন্থী।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল দুই নেতার মধ্যকার ব্যক্তিগত বাদানুবাদ নয়, এর পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ রয়েছে। জি-৭ এবং ন্যাটোর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালি অন্যতম প্রধান অংশীদার। বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইউক্রেন সংকট এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যকার সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের এই ধরনের বক্তব্য আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের মিত্রদের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থায় নতুন করে ফাটল ধরাতে পারে।

বিশ্লেষকেরা আরও মনে করছেন, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক ও আধিপত্যবাদী মন্তব্য আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য member দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো যখন নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার, তখন ওয়াশিংটনের এমন আচরণ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে সংকুচিত করে তুলবে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিলের মধ্য দিয়ে রোম স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে তারা কোনো ধরনের আপস করবে না। এই কূটনৈতিক উত্তেজনার জল কতদূর গড়ায় এবং ওয়াশিংটন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ